শিশুদের জন্য ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবসের কিছু উৎসাহব্যাঞ্জক তথ্য

শিশুদের জন্য ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবসের কিছু উৎসাহব্যাঞ্জক তথ্য

প্রতি বছরের 15 ই আগস্ট দিনটিতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন করা হয়।অত্যন্ত উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে এটি পালন করা হয়ে থাকে।বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং লিঙ্গের মানুষ এই অনুষ্ঠানে এসে যোগ দেন, একত্রিত হন।কিন্তু এই প্রজন্মের শিশুরা জানে না আমাদের দেশ ভারতবর্ষ কীভাবে এই স্বাধীনতা অর্জন করেছিলএব্যাপারে এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলি আপনার শিশুরা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যাপারে জানতে পারে, শিখতে পারে ও বুঝতে পারে।ভারতের স্বাধীনতা অর্জন তথা স্বাধীনতা দিবস সম্পর্কে বেশ কিছু উৎসাহব্যাঞ্জক এবং কৌতুহল উদ্দীপক তথ্যগুলির বিষয়ে জানতে এই নিবন্ধটি পড়ুন, যেগুলি আপনার শিশুরাও শিখতে পারে।

aniview

কখন এবং কেন আমরা স্বাধীনতা দিবস পালন করি

ভারতের জনগণ ব্রিটিশের অধীনস্থ ছিল এবং পরাভূত ভারতে অত্যাচারের শিকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়াসের সাথে 1929 সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে তারা ভারতের জন্য পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী রাখার সিদ্ধান্ত নেয় 1930 সালের 26 শে জানুয়ারী।তবে ব্রিটিশরা সে ব্যাপারে রাজী হয় না এবং 1947 সালের 15 ই আগস্টের আগের মুহুর্ত পর্যন্ত তারা তাদের শাসন ও রাজত্ব চালিয়ে গিয়েছিল।

1947 সালের 18 ই জুলাই ইংরেজ সরকার একটি আইন পাশ করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে, 1947 সালের 15 ই আগস্ট ভারত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে উঠবে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনের অবসান ঘটবে।সুতরাং এই পরবর্তী তারিখেই ভারতবর্ষ তার স্বাধীনত অর্জন করেছিল এবং সেই দিন থেকেই প্রতি বছর 15 ই আগস্ট ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।এটা অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন যে, 26 শে জানুয়ারি তারিখটিও আমাদের কাছে স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পরবর্তীতে 1950 সালে ভারত একটি প্রজাতন্ত্র দেশ হয়ে ওঠার সময় থেকে এই তারিখটি আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে নিজেদের ভাগ্যের তথা নিয়তির মালিক হয়ে যাতে আমরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারি সেই স্বপ্ন নিয়ে আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য তাঁদের যে অসীম বীরত্বের ও ত্যাগের পরিচয় রেখে গেছেন তারই স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা দিবসটি উদ্‌যাপিত হয়ে থাকে।

ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাস

1600 এর দশকে ব্রিটিশরা প্রথম ভারতে বণিক হিসেবে এসেছিল এবং তৎকালীন ভারতের শক্তিশালী সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক তাদের সেই ব্যবসা করার অধিকারটি মঞ্জুর হয়েছিল।সেই সময় ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাটরা শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন। 1717 সালে মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ার কলকাতার আশেপাশে কয়েকটি গ্রামের কর আদায় করার ক্ষমতা ব্রিটিশদের প্রদান করেন যা ফারুকশিয়ারের ফরমান নামে পরিচিত।মুঘল সাম্রাজ্যে ভাঙ্গন ধরতে শুরু করার পরেই ব্রিটিশরা ভারতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলি দখল করা শুরু করে।1757 সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদদৌল্লা কে পরাজিত করার সাথে সাথে 1857 সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা সারা ভারতবর্ষ জুড়ে দ্রুত তাদের প্রসার শুরু করে।

1857 সালে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের উপর অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এবং সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে একটি বিশাল বিদ্রোহ হয়েছিল যেখানে বিভিন্ন পটভূমি থেকে উঠে আসা ভারতীয় নেতৃবৃন্দরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। অবশ্য এর আগেই ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নানা জায়গায় ছোটো ছোটো বিদ্রোহ দেখা যায় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সাঁওতাল পরগণায় সিধু, কানু, চাঁদ ভৈরব প্রমুখের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাঁওতাল বিদ্রোহ যা ভারতের আদিবাসী সমাজে ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।যাইহোক 1857 সালের এই মহাবিদ্রোহ স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ হিসেবে প্রখ্যাত এবং ব্রিটিশরা এরপর ভারতের অভ্যন্তরে অন্যান্য অঞ্চলে তাদের প্রসার বন্ধ করে দেয়।এর সাথে সাথেই ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হয়।ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া একটি সনদের মাধ্যমে ভারতবর্ষের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেন এবং তিনি হয়ে ওঠেন ভারত সম্রাজ্ঞী।

স্বাধীনতা আন্দোলন চলা সত্ত্বেও ব্রিটিশরা তাদের শাসন চালিয়ে যায়।দেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনটি সমগ্র জাতিকে একত্রিত করে।নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, ভগৎ সিং লোকমাণ্য তিলক,মৌলানা আজাদ প্রমুখের নেতৃত্ব ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গতি পায়। ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে বাধ্য করার জন্য জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি বহু আন্দোলন শুরু করেছিলেন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে 1945 সালের মধ্যে ব্রিটিশ অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং তারা এ কথা জানত যে এটি ছিল তাদের এই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ারই আগের একটি বিষয়।যাইহোক, তবে এই আনন্দের দিনেই অত্যন্ত দুঃখজনক একটা ঘটনাও ঘটেছিল যেখানে ভারতবর্ষকে বিভাজিত করা হয়েছিল ভারত এবং পাকিস্তানে।

শিশুদের দ্বারা ভারতবর্ষে কীভাবে 15ই আগস্ট দিনটি উদ্‌যাপিত হয়?

প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস সারা দেশ জুড়ে ব্যাপক আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসের সঙ্গে উদ্‌যাপন করা হয়ে থাকে।ভারতে এই দিনটি জাতীয় ছুটির দিন হিসাবে পালিত হয়।কিন্তু বিদ্যালয়গুলিতে সাধারণত এক বা দুই ঘণ্টার একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দিনটি পালন করা হয়ে থাকে।বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র ছাত্রীরা দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গানের সাথে নৃত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন করে থাকে।হাম সব ভারতীয় হ্যায়‘, ‘বন্দেমাতরম‘, ‘হাম হোঙ্গে কামিয়াবইত্যাদি দেশাত্মবোধক গানগুলি গাওয়ার মাধ্যমে ঐ দিনটিকে আরও বিশেষ করে তোলা হয় সকলের মনে।জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়, শিশুরা জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে।সব শেষে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। 15ই আগস্ট দিনটিতে প্রায় প্রতিটি শিশুর হাতেই ছোটো ছোট জাতীয় পতাকা দেখা যায়।অনেকে আবার তাদের সাইকেলের হ্যান্ডেলে জাতীয় পতাকা বেঁধে নেয় আর তার পাড়ার চারপাশে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়ায়।সাইকেলের গতি যত বাড়ে পতাকা তত পত পত করে উড়তে থাকে।অনেক বাচ্চা আবার এই দিনটিতে সকাল থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর নেশায় লেগে পড়ে।

ভারতের স্বাধীনতা দিবসের কয়েকটি আকর্ষণীয় ঘটনাবলী

এখানে আমাদের স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে থাকা কয়েকটি আকর্ষণীয় ও তথ্যবহুল ঘটনাবলীর কথা আলচনা করা হল যা আপনি আপনার সন্তানকে বলতে পারেন।

  • যখন ভারতবর্ষ স্বাধীন হয় তখন কোনও জাতীয় সঙ্গীত ছিল না।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা জন গন মন অধিনায়কযেটি 1911 সালে প্রথম গাওয়া হয়েছিল সেটি জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গৃহীত হয় 1950 সালে।
  • যখন ভারত স্বাধীন হয় তখন ভারতে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, এমনকি কোনওরকম গর্ভমেন্ট বা সরকার বলে কোনওকিছু ছিল না।এই সমস্ত বিষয়গুলি আসে যখন থেকে ভারত একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।স্বাধীনতার সময়ে গর্ভনর জেনারেল ছিলেন ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ব্যাক্তি।
  • সেই সময় প্রকৃতপক্ষে ভারতের বিভিন্ন অংশে নানা স্বাধীন রাজ্য অবস্থান করত।সেইসময় ভারতে 565 টি স্বাধীন রাজ্য বা প্রিন্সিপাল স্টেট ছিল।খুব দ্রুত এই সব কিছুর পরিবর্তন ঘটে, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দের নানা ধরণের কৌশলে মাধ্যমে এই সব রাজ্যগুলি ভারতের অর্ন্তভূক্ত হয়।জম্মুকাশ্মীর, হায়দারাবাদ, মহীশূর এবং ত্রিভাঙ্কুর ইত্যাদি কয়েকটি বড় বড় রাজ্য যা ভারতে অর্ন্তভূক্ত হয়েছিল ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে।
  • ভারতই হল একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে 15 ই আগষ্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়।ঐ একই দিনে বেশ কিছু রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছিল অবশ্য বিভিন্ন সালে।এই দেশগুলি হল বাহারিন, উত্তর কোরিয়া, কঙ্গো, লিচটেনস্টেইন এবং দক্ষিণ কোরিয়া।

  • গোয়া ছিল পর্তুগীজদের উপনিবেশ যা ভারত স্বাধীন হওয়ার বহু বছর পর 1961 সালে ভারতে অর্ন্তভূক্ত হয়।অনেক পড়ে সিকিম অঙ্গরাজ্য হিসাবে ভারতে অর্ন্তভূক্ত হয়।
  • সরকারীভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন করা হয় দিল্লীর লালকেল্লা থেকে। এখান থেকেই ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উত্তোলনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।
  • আমাদের স্বাধীনতা এসেছিল ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের মধ্য দিয়ে।হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছিলেন সাম্প্রদায়িক হানাহানি এবং পারষ্পরিক ঘৃণার আবহে, যেটি এই সময় খুবই প্রকট হয়ে উঠেছিল।বহু মানুষ দেশান্তরিত হয়েছিলেন যা ইতিহাসে সর্ব্বৃহৎ পরিযান বা মাইগ্রেশন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে।যদিও একথা মনে রাখতে হবে অনেক মানুষ আবার এই কঠিণ সময়ে তাদের প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ছিলেন নিজেদের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে।
  • জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন না করে তিনি অনশনে বসেছিলেন যাতে দেশভাগ জনিত কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের জনগন পারস্পরিক হিংসা বর্জন করেন এই অভিপ্রায়ে।
  • স্বাধীন ভারতের বর্ডার বা সীমারেখা স্থির করার কাজটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সিরিল জন র‍্যাডক্লিফকে।সবথেকে দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হল তিনি একবারের জন্যেও ভারতে আসেন নি তা সত্তেও তাকে ভারত ভাগের মত একটা দূরূহ কাজের চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছিল।এই ধংসাত্মক কাজের জন্য তিনি এতটাই বেদনাহত হয়েছিলেন যে তিনি তার মাহিনা বাবদ ভারতীয় মুদ্রায় 40,000 টাকা নিতে অসম্মত হন, যা সেই সময় ছিল এক বিপুল পরিমাণ অর্থরাশি।

ভারতের স্বাধীনতা সংক্রান্ত এই বিষয়গুলি হয়ত খুব বেশি লোকে জানে না।এই গুলি আপনি আপনার সন্তানকে বলুন যাতে সে তার নিজের দেশের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসটি জানতে পারে আর তার মধ্যে নিজের দেশের প্রতি শ্রদ্ধা গড়ে ওঠে।আমরা যদি স্বাধীনতা সম্পর্কিত কোনো ছোটোখাটো ঘটনা না বলে থাকি বা বলতে ভুলে গিয়ে থাকি তাহলে আপনি অবশ্যই তা আমাদের জানাতে ভুলবেন না।