একটি গর্ভপাত ঘটে যাওয়ার পর তা কীভাবে নিরাময় করা যেতে পারে

একটি গর্ভপাত ঘটে যাওয়ার পর তা কীভাবে নিরাময় করা যেতে পারে

যখন আপনার গর্ভপাত হয়ে থাকে,আপনার ভিতরে ক্ষতি হওয়ার এক গভীর অনুভূতি সৃষ্টি হয় এবং আপনি হয়ত সবকিছু থেকেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতেও চাইতে পারেন।একটি গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে এই বিরাট ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরেও বেঁচে থাকা মানসিক এবং শারীরিক উভয় দিক থেকেই বেশ চ্যালেঞ্জের হতে পরে।দেহ এবং মনের দিকে এর থেকে সম্পূর্ণরুপে পুনরুদ্ধার হতে আপনার কিছুটা সময় লাগবে। গর্ভপাতের সময় আপনি আপনার গর্ভবস্থার কতটা দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন তার উপর ভিত্তি করবে আপনার শারীরিক নিরাময়।এক্ষেত্রে,গর্ভপাত হওয়া থেকে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধারের জন্য আপনার কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময়ও লাগতে পারে।তবে এ ব্যাপারে আপনার আবার মানসিকভাবেও নিরাময় হয়ে ওঠার প্রয়োজন।আপনি আপনার দুঃখ প্রকাশ করার জন্য কিছুটা সময় নিতে পারেন এবং ধীরে ধীরে তা থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় পরিবার গঠনের পরিকল্পনা করুন। গর্ভধারণ করে আপনার পুনরায় গর্ভবতী হয়ে ওঠা সম্ভব।জেনে নিন,গর্ভপাতের পর কীভাবে আপনি শারীরিক এবং মানসিক উভয় ভাবেই আগের মত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারেন এবং কখন পুনরায় একটি শিশুর জন্য আপনি পরিকল্পনা করতে পারেন।

aniview

গর্ভপাতের পর কি আশা করবেন

একটি গর্ভপাতের মত পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধার হতে আপনার কয়েক সপ্তাহ অথবা এক মাস কিম্বা তারও বেশি সময় লাগবে।কিছু মহিলা আবার সম্পূর্ন রূপে নিরাময় হয়ে উঠতে আরও দীর্ঘ সময়ও নিতে পারেন।আপনি হয়ত শারীরিক এবং মানসিক উভয় দিক থেকেই ভেঙ্গে পড়বেন।গর্ভপাত হওয়ার পর আপনার শরীর এবং মনের মধ্যে যেগুলি হতে পারে এখানে দেওয়া হলঃ

১. আপনার শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর পড়া প্রভাবগুলি

আপনার শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর পড়া প্রভাবগুলি

  • গর্ভপাতের পর আপনি শরীরে একটা অস্বস্তিবোধ করবেন এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি রক্তপাতের অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।এই রক্তপাতটি মাসিক রক্তস্রাবেরই অনুরূপ হবে এবং জরায়ুর আস্তরণ থেকে ভ্রূণটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে রক্তপাতটি এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময়ের জন্য হয়ে থাকতে পারে।এই রক্তপাতের সময়সীমাটি আবার গর্ভপাতের ধরণের উপর,যার অর্থ হল সেটি কোনও ঔষধ সম্পর্কিত কিম্বা অস্ত্রপচার সংক্রান্ত গর্ভপাত ছিল কিনা তার ভিত্তিতে নির্ভর করবে।যদি কোনও ক্ষেত্রে এই রক্তস্রাবটি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে তবে সেক্ষেত্রে আপনার ডাক্তারবাবুর শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
  • গর্ভপাতের পর আপনি সামান্য দাগ পড়া অথবা হালকা রক্তপাত লক্ষ্য করতে পারেন।
  • আপনার স্বাভাবিক ঋতুস্রাব আপনার মাসিক চক্রের উপর নির্ভর করে গর্ভপাতে 3-6 সপ্তাহ পরে পুনরায় শুরু হবে।
  • আপনার তলপেটে তীব্র যন্ত্রণা হতে পারে যা আপনার গর্ভপাতের পরবর্তী 2 দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকতে পারে।এই যন্ত্রণাটি আপনার ঋতুস্রাবের সময় অনুভব করে থাকা মাসিক হওয়ার খিঁচুনিরই সমতুল্য এবং যা আপনার কোমড়ের দিকেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
  • আপনার স্তনগুলি একটি পৃথক ধরণের মনে হতে পারে।সেগুলি স্তন দুধে পূর্ণ হয়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারে অথবা স্তন থেকে দুধ নিঃসৃত হতে বা চুঁইয়ে পড়তে পারে(যদি আপনার গর্ভাবস্থাটি 12 সপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থায়ী থেকে থাকে)।যখন এরকম হয়ে থাকে,তখন এর সমর্থনযোগ্য একটি ব্রা কিম্বা বরফের প্যাক এই ধরনের অস্বস্তি থেকে কিছুটা স্বস্তি আনতে সহায়তা করতে পারে।তবে এই অস্বস্তিটি এক সপ্তাহের বেশি থাকা উচিত নয়।যাইহোক,যদি সেটি থেকে থাকে তবে আপনার ডাক্তারবাবুর সাথে আলোচনা করুন।
  • গর্ভাবস্থায় মুক্ত হওয়া hCG হরমোন গর্ভপাতের পরে এক বা দুই মাস আপনার রক্ত ​​প্রবাহে থাকতে পারে এবং প্ল্যাসেন্টাল কলাটি সম্পূর্ণরূপে পৃথক হওয়ার পরেই কেবল সেটি শূন্যে চলে আসবে।
  • যদি আপনার ডাক্তারবাবু আপনার দেহে D&C সার্জারিটি করে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে আপনার মধ্যা একটি সংক্রমণ হতে পারে।জরায়ুর মধ্যে রয়ে যাওয়া ভ্রূণের কলা অপসারণের জন্য এবং জরায়ুর মধ্যে যোনির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে ডায়ালেশন এবং কারেটেজ (D&C) অস্ত্রপ্রচারটি সম্পন্ন করা হয়।যদি অবশিষ্টাংশগুলি অপসারণ না করা হয় তবে শ্রোণীজনিত ব্যথা এবং যোনি স্রাব ঘটতে পারে।যন্ত্রণা,খিঁচুনি বা টান লাগা,রক্তপাত এবং জ্বর হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার একজন ডাক্তার দেখানো উচিত।
  • গর্ভপাত হওয়ার দুই সপ্তাহ পর জরায়ুটি পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে এবং সার্ভিক্সটি বন্ধ হয়ে যাবে।জরায়ুটি তার স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসার ক্ষেত্রে জরায়ু অঞ্চলটিতে মালিশ করা সেক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে উঠবে।কিছু ক্ষেত্রে আবার যদি জরায়ুর মধ্যস্থ বস্তুগুলি পুরোপুরি খালি না হয়,অসম্পূর্ণ গর্ভপাত ঘটবে,যা মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক এবং রক্ত ক্ষরণের কারণ হয়ে উঠবে।

২. আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর পড়া প্রভাবগুলি

আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর পড়া প্রভাবগুলি

  • গর্ভপাত হওয়ার পর অপরাধবোধ এবং রাগ আপনার দ্রুত সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে।আপনার গর্ভপাতের পর আপনি হয়ত এই তীব্র অনুভূতিগুলি অনুভব করতে পারেন।সন্তানকে হারানোর জন্য আপনি নিজেকে তীব্র দোষারোপও করতে পারেন।আর আমরা জানি এটি যুক্তিহীন বলে মনে হলেও মাঝেমধ্যে আবার আপনি অন্যদের উপর দোষারোপ করে মেজাজও দেখাতে পারেন এমনকি আপনার মা-বাবা,ঈশ্বর অথবা এমনকি আপনার ডাক্তারবাবুর উপরেও।আপনি আবার আপনার চারপাশের গর্ভবতী মহিলাদের দেখে ঈর্ষান্বিত এবং রুষ্টও হয়ে উঠতে পারেন।
  • আপনি ঘটনাটি অস্বীকার করার মত পরিস্থিতিতেও উপনীত হতে পারেন এবং হয়ত বা নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন যে “কীভাবে এটি আপনার সাথে হতে পারে?”আপনি যে আপনার সন্তানকে হারিয়েছেন এ-কথাটি আবার আপনি বিশ্বাস নাও করতে পারেন।এই মানসিক বাধাটি হয়ে থাকে ট্রমা থেকে আপনার মনকে রক্ষা করার জন্য।
  • গর্ভপাতের পর আপনার মধ্যে বিষণ্নতা এবং হতাশাবোধ প্রবল হয়ে উঠতে পারে।গর্ভপাতের পর বহু মহিলাই হতাশায় পড়ে যান।যা দীর্ঘ ব্যাপ্তির কারণে তীব্র দুঃখে পরিণত হয়,প্রতিদিনের কজকর্মগুলিতে উৎসাহ হ্রাস পায় এবং ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়।আপনি আর কখনও কোনও সন্তান লাভ করতে সক্ষম হয়ে উঠবেন কিনা তা ভেবেও আবার আপনি চিন্তান্বিত হয়ে উঠতে পারেন।আর এটিই আপনার মধ্যে নিরাশা আর দুর্বলতাবোধকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
  • এটি ঘটে যাওয়ার কয়েক মাস পর আপনার সাথে যা ঘটে গেছে সেটি আপনি পরিশেষে মানতে এবং সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবেন। উপরিল্লিখিত সকল আবেগ-অনুভূতিগুলি আপনি বিভিন্ন কোণ থেকে অনুভব করার পর,একটা এমন দিন আসবে যখন আপনি আপনার ক্ষতিটিকে মেনে নিতে সমর্থ হবেন।আপনি হয়ত কখনই এটি ভুলে যেতে পারবেন না,তবে আপনি এটি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।আপনি আপনার জীবন পুনরায় ফিরে পাবেন এবং এগিয়ে যাবেন।

এ ব্যাপারে আরও কিছু বিশেষ জটিলতা রয়েছে যেগুলি গর্ভপাতের পর বেড়ে যেতে পারে।সেগুলি হতে পারে একটি অসমাপ্ত বা অসম্পূর্ণ গর্ভপাত অথবা D & C অস্ত্রোপচারের পরবর্তী জটিলতাগুলি কিম্বা এটি ঘটার সাত দিন পরেও অনবরত রক্তপাত হতে থাকা,যেটি একটি সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকতে পারে।যদি কোনও ক্ষেত্রে গর্ভপাতের পর আপনার মধ্যে জ্বর,পেট ব্যথা,যোনি থেকে তীব্র রক্তক্ষরণ অথবা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব অব্যাহত রয়ে যায়, আপনার ডাক্তার বাবুর মনোযোগ আকর্ষণ করা প্রয়োজন।

গর্ভপাতের পর কীভাবে নিজের যত্ন নেবেন

গর্ভহানী আপনাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে তুলতে পারে।আপনি সব কিছু থেকে উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারেন এবং আপনি সবকিছু থেকে এবং সবার থেকেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারেন।তবে আপনি যদি সম্পূর্ণরুপে সুস্থ হয়ে সেরে উঠতে চান তবে সেক্ষেত্রে গর্ভপাতের পর আপনার নিজের যত্ন নেওয়া কিন্তু খুবই জরুরী।আপনার সন্তানটি হয়ত আর বেঁচে নেই কিন্তু তাই বলে এর অর্থ এই নয় যে আপনি আপনার স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াও বন্ধ করে দেবেন।গর্ভপাতের পর শারীরিক এবং মানসিক পুনরুদ্ধারের জন্য আপনার অনুসরণ করা উচিত এমন কয়েকটি পদক্ষেপ নিম্নে আলোচিত হলঃ

১. শারীরিক পুনরুদ্ধার

গর্ভপাতের পরে 2 সপ্তাহ ধরে আপনি খিঁচুনি,যন্ত্রণা এবং রক্তপাত অনুভব করবেন।এখানে কিছু পরামর্শ দেওয়া হল যেগুলি শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে আপনাকে সাহায্য করবে।

  • বিশ্রাম নিনঃ সব দিক থেকে ভীষণ বড় মাপের একটি আঘাত পাওয়ার কারণে আপনার নিরাময় হয়ে ওঠার জন্য সময়ের প্রয়োজন।তাই যতটা বেশি সম্ভব নিজেকে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সময় দিন।রাত্রে ঘুমাতে যদি আপনি অসমর্থ হয়ে ওঠেন তবে সে ক্ষেত্রে এক গ্লাস গরম দুধ পান করুন।এছাড়াও আপনি আবার কিছু হালকা অনুশীলনও করতে পারেন,এগুলি আপনাকে ভালভাবে ঘুমাতে সহায়তা করবে।
  • ওষুধ গ্রহণ করুনঃ গর্ভপাতের পর আপনি কিছু পরিমাপ যন্ত্রণা অনুভব করবেন।এর জন্য আপনি কিছু ব্যথানাশক ট্যাবলেট গ্রহণ করতে পারেন,তবে সেগুলি গ্রহণের পূর্বে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে নিন।যন্ত্রণাটি সেরে যাওয়ার পরিবর্তে যদি কেবলই বাড়তে থাকে,তবে অবশ্যই আপনার ডাক্তার দেখানো উচিত।
  • গরম এবং ঠাণ্ডা কমপ্রেসের ব্যবহারঃ গর্ভপাতের পর বহু মহিলা আবার বাজে ধরনের একটি মাথা ব্যথা অনুভব করে থাকেন।আপনি এই যন্ত্রণাকে প্রশমিত করতে পারেন একটি গরম অথবা ঠণ্ডা কমপ্রেস মাথায় প্রয়োগের মাধ্যমে।একটি গরম অথবা ঠাণ্ডা কমপ্রেস আপনাকে দ্রুত স্বস্তি এনে দিতে পারে।
  • আপনার তাপমাত্রা লক্ষ্য রাখুনঃ গর্ভপাত হওয়ার পর প্রথম পাঁচ দিন আপনার দেহের তপমাত্রা লক্ষ্য করুন।যদি সেটি বেড়ে 99.7 ডিগ্রী ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যায় তবে অবিলম্বে আপনার ডাক্তারবাবুর কাছে যান কারণ এই সময় জ্বর হওয়া দেহের একটি সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়।
  • যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখুনঃ গর্ভপাতের পর আপনার রক্তপাত হবে,আর এই সময় কাপড়ের ন্যাকড়ার পরিবর্তে আপনি স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করুন।যদি আপনি কাপড়ের ন্যাকড়া ব্যবহার করে থাকেন সেক্ষেত্রে আপনার যোনি সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।সুতরাং সেগুলি এড়িয়া চলুন।এছাড়াও এই সময় প্রতিদিন দু’বার করে স্নান করুন।
  • স্বাস্থ্যকর খাবার খানঃ আপনি পরিমাণ মত প্রোটিন,কার্বোহাইড্রেট,ফাইবার,ফ্যাট এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া নিশ্চিত করুন।একটা গর্ভপাতের পর আপনার দেহের নিরাময়ের জন্য এর নিজস্ব জ্বালানির প্রয়োজন।তাই আপনার ডায়েটে ডিম,চীজ,লাল মাংস,পোলট্রি,নারকেল তেল,মাখন,সম্পূর্ণ ফল এবং বিভিন্ন ধরণের সবজি অন্তর্ভূক্ত করুন।যেহেতু গর্ভাবস্থায় দেহে ক্যালসিয়ামের মাত্রা হ্রাস পায়,তাই আপনার ডায়েটে দুধ,ড্রাই ফ্রুট,সয়া এবং সবুজ শাক সবজির মত ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারগুলিকে অন্তর্ভূক্ত করাও জরুরী।
  • নিজে হাইড্রেট থাকুনঃ আপনি হাইড্রেট থাকার জন্য প্রতিদিন কম করে অন্তত আট গ্লাস জল খাওয়া নিশ্চিত করুন।এছাড়াও আপনি আবার ফলের রস,চা এবং গরম ঝোল বা স্যুপ পান করতে পারেন ক্যাফিন এবং অন্যান্য ক্যাফিনেটেড তরলগুলি পান করা এড়িয়ে চলুন কারণ এগুলি আপনার দেহকে জলশূণ্য করে তুলতে পারে যা আপনার পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
  • কয়েক সপ্তাহ যৌন মিলন এড়িয়ে চলুনঃ গর্ভপাতের পর প্রথম দুই সপ্তাহ মত যৌন মিলন এড়িয়ে চলুন কারণ এই সময় আপনার দেহ নিরাময়ের পর্যায়ে থাকবে।রক্তপাত শেষ হওয়া এবং জরায়ুটি বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।কখন থেকে আপনি আবার যৌন মিলন করতে পারেন অথবা অন্য আরেকটি সন্তান ধারণের চেষ্টা করতে পারেন সে ব্যাপারে আপনার ডাক্তারবাবুর সাথে আলোচনা করে নেওয়ার পরামর্শই দেওয়া হল।
  • নিয়মিত চেক-আপের জন্য যানঃ গর্ভপাত হওয়ার পর আপনি নিয়মিত ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করান যাতে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে আপনার মধ্যে কোনওরকম যৌনবাহিত রোগ(STD গুলি),ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণগুলি এবং এমন কিছু সমস্যা যেগুলি আপনাকে পুনরায় গর্ভবতী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করতে পারে সেগুলি নেই।
  • একটি মালিশ করানো বিবেচনা করুনঃ প্রজনন সহায়ককারী একটি মালিশও আবার জরায়ু এবং সার্ভিক্সে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং হরমোন ভারসাম্যকে উন্নত করে।

২. মানসিক পুনরুদ্ধার

মানসিক পুনরুদ্ধার

গর্ভাবস্থাকে হারিয়ে ফেলা একজন মহিলার ক্ষেত্রে বেশ কঠিণ হতে পারে।যদি আপনার গর্ভপাত হয়ে গিয়ে থাকে তবে আপনি দুঃখ, রাগ, হতাশা, বিরক্তি এই অনুভূতিগুলির একটি পরিসীমা অনুভব করতে পারেন, তবে আপনি যদি পুনরায় গর্ভবতী হয়ে উঠতে চান তবে আপনাকে সম্পূর্ণরূপে সেরে উঠতে হবে। শারীরিক পুনরুদ্ধার কেবল একাই এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে না।অন্ধকারের সেই গভীর সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসতে কীভাবে আপনি নিজেকে সহায়তা করতে পারেন তার সন্ধান করুন।

  • ডাক্তারের সহযোগীতা নিনঃ একজন ডাক্তারই হল সাধারণত সেই প্রথম ব্যাক্তি যিনি গর্ভপাত হওয়ার পর আপনাকে সহযোগীতা করতে পারেন।আপনার গর্ভাবস্থার ক্ষতি হতে পারে এ বিষয়ক সকল কারণগুলিকে(যেমন ডিম্বাশয়ের সিস্ট,ধূমপান,মানসিক চাপ ইত্যাদি) তিনি আপনার কাছে ব্যাখ্যা করবেন।এটি আপনার পরবর্তী গর্ভাবস্থাটির ক্ষেত্রে আপনাকে ভালভাবে প্রস্তুত হতে সহায়তা করবে।
  • নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করুনঃ একটি গর্ভপাত হয়ে থাকে চিকিৎসাজনিত অস্বাভাবিকতার কারণে,এতে আপনার কোনও দোষ নেই।এটি যে কিছু চিকিৎসা সমস্যার কারণে হয়েছিল সেটি আপনাকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে আর এটিকে মেনে নিয়ে আপনি ভবিষ্যতে একটি পরিবার পরিকল্পনা করার দিকে এগিয়ে যান।
  • মানসিক চাপ নেবেন নাঃ গর্ভপাতের পর আপনার হরমোন স্থিতিশীল অবস্থায় থাকবে না এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময় নেবে।আপনার হরমোনের এই উত্থান পতন আপনাকে খিটখিটে এবং মেজাজী করে তুলবে।সুতরাং নিজেকে সেদিক থেকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা করুন।
  • যোগাযোগঃ যদিও দুঃখ হওয়াটাই স্বাভাবিক তথাপি সেই শোকে মুষড়ে পড়ে নিজেকে ভেঙ্গে ফেলবেন না,আপনার নিকট কারুর সাথে কথা বলুন।আপনার কাছের যারা যেমন আপনার বন্ধু,পরিবার অথবা আপনার পেশাদার কাউকে আপনি যা অনুভব করছেন তা ব্যক্ত করুন।আপনার সঙ্গীটির সাথেও কথা বলতে মনে রাখবেন কারণ সেও তার সন্তানটিকে হারিয়েছে।এই বিষয়ে কথাবার্তা বলার মাধ্যমে আপনাদের দুজনের নিরাময়ের ক্ষেত্রেই সহায়ক হবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে চলার পথ সুগম হবে।
  • যোগ-ব্যায়াম অনুশীলনঃ আপনার দেহের সঞ্চালনা এন্ড্রোফিনগুলিকে মুক্ত করে এবং আপনার মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে।সুতরাং আপনি শারীরিকভাবে এটির জন্য প্রস্তুত হন এবং ব্যায়াম করা শুরু করুন।আপনি হালকা কিছু ছোটখাটো দিয়ে শুরু করতে পারেন যেমন হাঁটা,যোগা করা ইত্যাদি।অবশেষে, আপনি অনুশীলনে স্নাতকতা লাভ করতে পারেন, তবে তা কেবলমাত্র একজন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করার পরেই।
  • ওষুধ গ্রহণ করুনঃ হতাশার চরম ক্ষেত্রে আপনার ডাক্তারবাবু অ্যান্টি-ডিপ্রেশন এবং সাইকোথেরাপির মত চিকিৎসা এবং খুব বিরল ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি করানোর পরামর্শ দিতে পারেন।তবে গর্ভপাতের পর মানসিক নিরাময়ের জন্য হতাশার থেকে আপনাকে বেরিয়ে আসার প্রয়াস করতে হবে।

গর্ভপাতের পর সুস্থ হয়ে উঠতে দেহ কত সময় নেয়?

একটি গর্ভপাতের পর আপনার দেহ সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠতে কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় নিতে পারে।যোনি রক্তক্ষরণ এক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে এবং পেটে ব্যথা দুই দিনের জন্য থাকে।আর মানসিক নিরাময়টি নির্ভর করবে ভ্রূণের সাথে মায়ের ভাগ হওয়া সংবেদনশীল বন্ধনের উপর।এ ক্ষেত্রে আপনার নিজেকে নিজের সময় দেওয়াটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।দুঃখ হওয়াটা তো এক্ষেত্রে স্বাভাবিক,তবে সময়ের সাথে সাথে আপনি ধীরে ধীরে আপনার মধ্যা হয়ে যাওয়া ক্ষতিটিকে মেনে নিতে এবং কিছুটা ভাল বোধ করতে শুরু করবেন।

গর্ভাবস্থার ক্ষয়-এটিকে মেনে নেওয়া যে খুবই কঠিন-এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই,কিন্তু আপনি মনে রাখবেন যে,এটি আপনার জীবনকে নিঃশেষ করে দেয় না।আপনি সবসময়েই অপর আরেকটি শিশুর জন্য চেষ্টা করতে পারেন।অপর একটি সন্তানের জন্য পরিকল্পনা করার সময়টি প্রাথমিকভাবে আপনার পুনরুদ্ধারের উপর নির্ভর করবে।

গর্ভপাতের পর গর্ভধারণ করা

গর্ভপাতের পর গর্ভধারণ করা

একবার গর্ভপাতের পর পুনরায় গর্ভধারণের চেষ্টা করার পূর্বে ডাক্তাররা সাধারণত মহিলাদের কয়েক মাস অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।তবে এই সময় জরায়ু বেশ স্থিতিস্থাপক থাকে।সুতরাং সেই কারণে কিছু ডাক্তার আবার আপনার একটি স্বাভবিক মাসিক চক্র হওয়ার সাথে সাথেই যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব অন্য আরেকটি সন্তান নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন।তবে আপনার এই বিশেষ পরিস্থিতির ব্যাপারে আপনার ডাক্তারবাবুর সাথে যোগাযোগ করা ভাল।এক্ষেত্রে আপনার জরায়ুর মধ্যে হয়ত ক্ষত চিহ্ন বা দাগ অথবা প্ল্যাসেন্টার টুকরো বিশেষ অবশিষ্ট থাকতে পারে,যে ক্ষেত্রে আপনার ডাক্তারবাবু হয়ত আপনাকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করার পরামর্শ দেবেন।

একবার গর্ভপাতের পর পুনরায় গর্ভধারণের চেষ্টা করার আগে আপনার দেহেরই কেবল সম্পূর্ণ রূপে সুস্থ হয়ে ওঠা প্রয়োজন নয়,আপনার আবেগগুলিও পুনরায় স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজন।যদি আপনি গভীরভাবে আহত হয়ে থাকেন,তবে অপেক্ষা করার জন্য প্রস্তাবিত সময়সীমা হবে ছয় মাস থেকে এক বছর।সবসময় নিজে মনে রাখবেন যে,আপনি পুনরায় পূর্ণ গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনায় থাকবেন এবং একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দেবেন।

গর্ভপাতের পর যে সাবধানতাগুলি অবলম্বন করতে হবে

এ ব্যাপারে এমন কিছু বিশেষ সাবধানতা আছে যেগুলি গর্ভপাতের পরে ,বিশেষত ভবিষ্যতের গর্ভপাত রোধ করার ক্ষেত্রে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য আপনার অবলম্বন করা প্রয়োজন হবে।নিম্নে তালিকাবদ্ধ সাবধানতাগুলি অনুসরণ করুন-

  • গর্ভপাতের পর অন্ততপক্ষে একটি মাসিক চক্র সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আপনি পুনরায় সন্তান ধারণের চেষ্টা করবেন না।
  • নিয়মিত অনুশীলন করুন এবং আপনার ওজনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখুন।
  • যদি আপনি পুনরায় গর্ভবতী হতে চান,অ্যালকোহল পান এবং ধূমপান ত্যাগ করুন।এবং এর সাথে আপনার ক্যাফিন গ্রহণ সীমিত করুন।
  • আপনার ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে প্রতিদিন পেরেন্টাল ভিটামিন এবং ফোলিক অ্যাসিডের সম্পূরকগুলি গ্রহণ করুন।
  • স্বাভাবিকের তুলনায় একটু অন্যরকম যোনি স্রাবের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখুন।
  • আপনার গর্ভপাতের প্রভাবগুলি সম্পূর্ণরূপে কাটিয়ে ওঠা না পর্যন্ত শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলুন।এটি কোনও রকম সংক্রমণের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা রোধে সহায়তা করবে।
  • যদি আপনার মধ্যে জ্বর এবং দেহের তাপমাত্রা উচ্চ মাত্রায় বাড়তে থাকে,এটিকে অবহেলা করবেন না কারণ এটি একটি সংক্রমণের সংকেত হতে পারে এবং পরিণামে বন্ধ্যাত্ব হতে পারে।
  • যদি রক্তপাত বন্ধ না হয় অথবা যন্ত্রণাটি যদি দীর্ঘ সময় ধরে অব্যহত থাকে,তবে সেক্ষেত্রে কখন আপনি আবার গর্ভধারণের চেষ্টা করতে পারেন সে ব্যাপারে আপনার ডাক্তারবাবুর কাছে অবশ্যই পরীক্ষা করিয়া নেওয়া উচিত।

একবার গর্ভপাতের পর কত শীঘ্র আপনি পুনরায় আপনার স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মে ফিরে আসতে পারেন?

যত শীঘ্র আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন তত তাড়াতাড়ি আপনি আপনার স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মগুলি শুরু করতে পারেন।গর্ভপাতের চিকিৎসার জন্য তা সে অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়াটি সম্পাদন করা হোক বা না হোক,কোনওরকম কঠোর অনুশীলন শুরু করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে নেওয়া উচিত।কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হয়ত আপনি আপনার নিয়মিত রুটিন ফিরে পেতে পারেন,কিন্তু আপনার শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনও কিছুই আপনার এড়িয়ে চলা উচিত।সংক্রমণগুলি এড়াতে,কয়েক সপ্তাহের জন্য সঙ্গম করা থেকে এবং আপনার যোনির অভ্যন্তরে কোনও কিছু প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকুন।যদি আপনার উদ্বেগের কোনও কারণ থাকে আপনার ডাক্তারবাবুকে বলার ক্ষেত্রে দ্বিধাবোধ করবেন না।

একটি গর্ভপাত হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার।একজন মহিলার জীবনে অনুভব করা সবচেয়ে খারাপ জিনিসগুলির মধ্যে একটি হল তার সন্তানকে হারানো।কিন্তু শারীরিক এবং মানসিক দিক থেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠার মাধ্যমে আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।আর যত তাড়াতাড়ি আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন তত তাড়াতাড়ি আপনি অপর আরেকটি সন্তান গ্রহণের চেষ্টা শুরু করতে পারবেন।অধিকাংশ মহিলার ক্ষেত্রে,গর্ভপাত হল একটি এককালীন বিষয় এবং ভবিষ্যতের উর্বর প্রজননের একটি ইঙ্গিত।সুতরাং কখনই আশা হারাবেন না।