গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত লালা

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত লালা

একবার গর্ভধারণ করলে,বহু মহিলাই তাদের শরীরে বহু পরিবর্তন হতে লক্ষ্য করে থাকেন।দ্রুত লক্ষ্যণীয় সেগুলির মধ্যে একটি হল স্বাভাবিকের তুলনায় তারা হয়ত বেশী লালা উৎপাদন করতে পারেন।চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘টিয়ালিজম গ্র্যাভিড্যারাম’ নামে অভিহিত,এটি সাধারণত নিজে থেকেই হয়ে থাকে,মর্নিং সিকিনেসের কারণে অথবা হরমোনের মাত্রার উত্থান পতনের দ্বারা এটি আরও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে।

aniview

গর্ভাবস্থায় আপনি যদি অত্যধিক লালা নিঃসরণের অভিজ্ঞতা লাভ করেন সেটি কি স্বাভাবিক?

অবশ্যই,আপনি যদি গর্ভবতী হয়ে থাকেন তবে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশী পরিমাণ লালা নিসৃত হওয়া সম্পূর্ণরূপে স্বাভাবিক।সাধারণ অবস্থায়,যে লালা গ্রন্থিগুলি স্যালিভা উৎপন্ন করে সম্পূর্ণ দিন জুড়ে মোটামুটি প্রায় 600 মিলি.লি মত স্যালিভা উৎপাদনের প্রবণতা থাকে।যেটা বেশ অনেকটা পরিমাণ বলেই মনে হয় কিন্তু সেটা আমাদের অলক্ষ্যেই থেকে যায় কারণ আমরা সর্বক্ষণই অনবরত সেগুলিকে গিলে ফেলি।গর্ভাবস্থায় এই স্যালিভার পরিমাণ হয়ত কিছুটা বাড়তে পারে অথবা সেই লালা গিলে ফেলার প্রবণতা কিছুটা হয়ত কমতেও পারে,যেটি আমাদের মধ্যে বিশ্বাস জাগায় যে লালা নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

কিছু মহিলার আবার লক্ষণীয় ভাবে প্রচুর লালা নিসৃত হতে থাকে যখন তাদের বমি উঠে আসে।এই সব ক্ষেত্রে থুতু ফেলার মত করে লালা অনুভূত হয়।

কখন এটি শুরু হয়?

কেউ কেউ বিশ্বাস করতে পারেন যে প্রারম্ভিক গর্ভাবস্থার উপসর্গ হিসেবে লালার বৃদ্ধি পাওয়া গর্ভাবস্থার একটি শক্তিশালী লক্ষণ হতে পারে।তবে অতিরিক্ত লালা উৎপাদনের প্রবণতা শুরু হয় গর্ভধারণের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহে এবং মোটামুটি প্রায় প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।বিশেষ কিছু মহিলার ক্ষেত্রে,এই লালা নিঃসরণ সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত প্রায় সম্পূর্ণ গর্ভাবস্থা জুড়েই বজায় থাকে।

গর্ভাবস্থায় লালা নিঃসরণের কারণগুলি

বহু মহিলা তাদের গর্ভাবস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিকে অত্যধিক লালা হওয়া লক্ষ্য করতে পারেন এবং অবাক হয়ে উঠতে পারেন এর পিছনের কারণগুলিতে।তার মধ্যে কিছু হলঃ

  • একজন গর্ভবতী মহিলার দেহে হরমোনের বহু পরিবর্তন হতে থাকে,যা্র ফলে অত্যধিক লালা নিঃসরণ হতে পারে।
  • গা গুলানো এবং মর্নিং সিকনেসের সাধারণ প্রবণতার কারণে গর্ভবতী মহিলারা খুব বেশী গিলে ফেলতে পারে না কারণ এর স্বাদটা তাদের কাছে অপ্রিতীকরকর হয়ে উঠতে পারে এবং এমনকি এর ফলে তাদের আরও বেশী গা গুলিয়েও উঠতে পারে।এর ফলে মুখের ভিতর ক্রমশ লালা জমতে থাকে।
  • শিশুকে সুরক্ষিত রাখা বজায় রাখে জরায়ুর প্রসারণ এবং পরিশেষে এটি উদরে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।উদরের এই চাপের কারণে সেটি রূপান্তরিত হয়ে খাদ্য নালীর অভ্যন্তরস্থ উপাদানগুলির উপরে চাপ প্রয়োগ করে একটা বাজে অস্বস্তি এবং জ্বলন অনুভূতির সৃষ্টি করে।শারীরিক প্রতিফলন হিসেবে,খাদ্যনালীর কারণে পেটের অ্যাসিড এবং জ্বলন অনুভূতিকে প্রশমিত করতে লাল গ্রন্থিগুলি আরও বেশী লালা উৎপাদন করে।
  • যদি কোনও গর্ভবতী মা দন্তক্ষয়,দন্ত গহ্বর,দাঁতের ক্ষয় রোগ অথবা এধরণের আরও অন্যান্য কোনও মুখের সংক্রমণে ভুগে থাকেন,তবে এই দৃশ্যকল্পে লাল নিঃসরণ বাড়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে এবং সেটি অত্যধিকও হতে পারে।
  • কিছু বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার কারণে শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে লালা তৈরির পদ্ধতিতে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
  • অ্যান্টিকনভালসেন্টস, লিথিয়াম, ট্রানকুইলাইজারস নামক এবং এরকম বেশ কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ লালা গ্রন্থিগুলির সহিত প্রতিক্রিয়া করে বলে জানা যায় এবং তার ফলে সেগুলি অত্যধিক মাত্রায় লালা উৎপন্ন করে।

বর্ধিত লালা নিঃসরণের সুবিধা

  • বর্ধিত লালা নিঃসরণ পাকস্থলীর যেকোনও অ্যাসিড,যা জ্বলন অথবা অস্বস্তিকর সংবেদনের কারণ হতে পারে,সেগুলিকে নিষ্ক্রিয় করতে সরাসরি কাজ করে।
  • মুখগহ্বরের লালা হল দাঁতকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে এমন ধরণের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা।
  • লালার মুখ্য ভূমিকাটি হল এটি মুখের মধ্যে হজম প্রক্রিয়াটিকে শুরু করে,পাকস্থলীকে সাহায্য করে এবং যার ফলে অন্ত্র খাদ্যকে সহজেই ভেঙে ফেলে।
  • ভিটামিন সম্পূরক অথবা এ ধরনের অন্যান্য কারণে কেউ কেউ মুখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া অনুভব করতে পারেন।এক্ষেত্রে লাল নিঃসরণ তার মুখের ভিতরাংশ পিচ্ছিল রাখতে এবং একটি ভিজা ভাব বজায় রাখতে সাহায্য করে।

গর্ভবতী থাকাকালীন অত্যধিক লালার জন্য চিকিৎসা

  • বহু মহিলা গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত লালা নিঃসরণের জন্য চিকিৎসার খোঁজ করার চেষ্টা করেন।এই অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এমন ধরনের বেশ কিছু প্রতিকার এক্ষেত্রে রয়েছে।
  • উচ্চ পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট আছে অথবা স্টার্চ-ভিত্তিক খাদ্য পদগুলিকে বাদ দিতে আপনার ডায়েটের পুনর্গঠন করুন।
  • আপনার মুখে উপস্থিত থাকতে পারে এমন ধরণের কোনও সংক্রমণের ক্ষেত্রে আপনার দন্ত চিকিৎসকের সহিত দেখা করুন এবং পরীক্ষা করান।মাড়ি সম্পর্কিত কিছু সমস্যাও মুখে অত্যধিক লালা উৎপাদনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

গর্ভবতী থাকাকালীন অত্যধিক লালার জন্য চিকিৎসা

  • ছোট ছোট বিরতির পুনরাবৃত্তিতে অল্প পরিমাণে খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে আপনার খাওয়ার সময়গুলির পুনরায় পরিকল্পনা করুন।
  • সারা দিন ধরে বারে বারে মাউথওয়াশের ব্যবহারও অত্যধিক লালা নিঃসরণের হ্রাসে সাহায্য করতে পারে।
  • প্রচুর পরিমাণে জল পান আপনার মুখের ভিতর আদ্র রাখে।এটি আবার লালাকে নিয়ন্ত্রণেও রাখে।
  • লালা গিলে ফেলার সাহায্যার্থে মিষ্টি ছাড়া বাবুলগাম অথবা মিন্টগুলি চিবোন।
  • বরফের একটি টুকরো নিয়ে সেটিকে কিছু সময়ের জন্য চুষুন।আপনার মুখের ভিতরটি অসাড় লাগবে এবং কিছু সময়ের জন্য কম লালা উৎপন্ন করবে।
  • লালা নিঃসরণ হ্রাস করতে আদা অথবা লেবুর টুকরোকে চিবোবার চেষ্টা করুন।এটি করার আগে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
  • আপনার খাদ্য তালিকায় প্রচুর পরিমাণ মুচমুচে এবং আঁশযুক্ত ফল এবং শাক-সবজি চয়ন করুন।
  • লালা গিলে ফেলায় যদি আপনার গা গুলিয়ে বমি বমি ভাব হতে শুরু করে,একটি পৃথক কাপড়ের টুকরোয় অথবা একটি কাপের মধ্যে থুতু ফেলার মাধ্যমে সেটিকে মুখ থেকে বের করে দিন এবং নিয়মিত সেটিকে ফেলে দিন।
  • বিস্কুট খাওয়ার সময়,শুকনো এবং সাদামাটা বিস্কুটগুলিকেই পছন্দ করুন যা লালা শোষণে সাহায্য করবে।
  • যদি ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়ে বমি হওয়া তীব্র আকার ধারণ করে,অবিলম্বে আপনার ডাক্তারের সাথে দেখা করুন এর দ্রুত কোনও ওষুধ পাওয়ার জন্য।

গর্ভবতী থাকাকালীন আপনি কি অতিরিক্ত লালা হওয়া প্রতিরোধ করতে পারেন?

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ বন্ধ করতে আপনি যতটা জনতে চান না কেন,দুর্ভাগ্যক্রমে,এর কোনও সাবধানতা,অভ্যাস এবং বাহ্যিক কৌশল নেই যেগুলি লালা উৎপাদন হ্রাসে সাহায্য করতে পারে।এটি গর্ভাবস্থায় হয়ে থাকা দেহের অন্যান্য পরিবর্তেন মতই একটি পর্যায় যা সময়ের সাথে সাথে চলে যাবে।এটি নিয়ে খুব বেশী চিন্তা করবেন না অথবা আপনার মনকে প্রশমিত হতে দিন এবং আপনার সাথে যা ঘটছে সে বিষয়ে বিরক্ত হয়ে উঠবেন না।এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।সুতরাং,আপনি যতটা পারেন বিষয়টিকে হালকা ভাবে নিন।

কখন একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?

অত্যধিক লালা হওয়া অত্যন্ত অদ্ভুত বলে মনে হতে পারে যখন একজন গর্ভবতী মহিলার মধ্যে সেটি শুরু হয়ে থাকে,কিন্তু এটি চারপাশের জনপ্রিয়তা ছাড়াই কেবল মর্নিং সিকনেসের মতই হয়ে থাকা সাধারণ একটা ব্যাপার।আপনার মধ্যে লালার নিঃসরণ তীব্র আকার না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা করুন অথবা সেটি তীব্র বমি করার সাথে সংযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত,এটির জন্য আপনার ডাক্তার দেখানোর কোনও কারণ নেই।তিনি আপনার মনকে প্রশমিত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে উঠতে পারেন কিন্তু চিকিৎসাগত ভাবে এ বিষয়ে সেরকম চিন্তা করার মত কিছু নেই।

একটি শিশুর লালা গড়ানো বেশ সুন্দর একটি ব্যাপার কিন্তু একজন গর্ভবতী মহিলার ক্ষেত্রে সেটি বেশ বিব্রতকর।শুধুই আপনার হৃদয়ে জেনে রাখুন যে,শরীরের এই ধরনের পরিবর্তন একটি প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া মাত্র এবং লালা গড়ানো বা অত্যধিক লালা নিঃসরণ একটি বিরক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।এটিকে বাদ দিয়ে গর্ভাবস্থার যাত্রাপথের অন্যান্য আরও ভাল অংশগুলির দিকে মনোনিবেশ করুন।