গর্ভাবস্থায় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করা

গর্ভাবস্থায় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করা

In this Article

গর্ভাবস্থায় একজন মহিলার দেহে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়শুধুমাত্র হরমোনের মাত্রার পরিবর্তন নয় আরো অন্যান্য জৈবিক বিষয়ের পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায় যেমন রক্তে শর্করার মাত্রারক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি গর্ভাবস্থায় খুব একটা অস্বাভাবিক নয়

aniview

গর্ভকালের ডায়াবেটিস বা মধুমেহ কি?

নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এই ধরনের ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগ মহিলাদের গর্ভদশায় হয়ে থাকেগর্ভসঞ্চারের ফলে কিছু কিছু মহিলার দেহে রক্তে শর্করার পরিমাণ প্রচুর বেড়ে যায় এই বিষয়টিকেই গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিস বলেকিছু কিছু মহিলার ক্ষেত্রে দেখা যায় গর্ভসঞ্চারের পর পরই তাদের দেহের মধ্যে রক্তে ইনসুলিনের পরিমাণ কমে যায়,ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হয় দেহের স্বাভাবিক ইনসুলিনের মাত্রার দ্বারা

গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিস অনেকের ক্ষেত্রেই হতে পারে যাদের হয়ত কখনওই ডায়াবেটিস ছিল না,সেসব ক্ষেত্রে দেখা যায় যে প্রসবের পরবর্তী সময়ে এই ডায়াবেটিসটি সম্পূর্ণ নিরাময় হয়ে গেছে

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের কারণগুলি কি?

গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ হল দেহে ইনসুলিনের মাত্রার ওঠাপড়াপাচন প্রক্রিয়াতে খাবারের মধ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেটগুলি গ্লুকোজে(শর্করাতে)ভেঙে যায়, যা থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়এই শক্তির দ্বারাই মানুষের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পন্ন হয়ে থাকেস্বাভাবিক অবস্থায় অগ্ন্যাশয় থেকে উৎপন্ন ইনসুলিন এই গ্লুকোজকে কোষে স্থানান্তরিত করার মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধিকে প্রতিহত করে

গর্ভদশায় অমরা নামক একটি পর্দা বিকাশমান গর্ভস্থ শিশুটিকে পুষ্টি পদার্থ এবং অক্সিজেন সরবরাহ করেএই সাধারণ কাজটি করা ছাড়াও আমরা নানা ধরণের হরমোন ক্ষরণ করে যা মায়ের শরীরের স্বাভাবিক হরমোন গুলির কার্যকারিতার ওপর প্রভাব বিস্তার করেজানা গেছে এটি ইনসুলিনের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, তার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায় এবং তাকে ভেঙে ফেলার মত পর্যাপ্ত ইনসুলিনের অভাবে ঘটেএটাই হলো একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার মূল কারণ

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস এর আরেকটি কারণ হল ওজনইনসুলিনের ক্ষরণ কমাবার ক্ষেত্রে স্থূলতার খুব নিকট সম্বন্ধ আছে যদি গর্ভধারণের পূর্বে মায়ের ওজন খুব বেশি হয় তাহলে তার গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেশি থাকে পাশাপাশি গর্ভদশায় ওজন বৃদ্ধির ব্যাপারটিকে মাথায় রাখতে হবে সমান গুরুত্ব দিয়ে

আপনার কি গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন?

আপনার কি গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন?

ভারতে প্রতি সাতজন পিছু একজন মহিলার গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি আছেকিন্তু বেশ কিছু মহিলার অন্যান্যদের তুলনায় ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি বেশি থাকে।এখানে কয়েকটি কারণ আলোচনা করা হল যা গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াবার জন্য দায়ীঃ

  • উচ্চ BMI: যে সকল মহিলারা গর্ভসঞ্চারের আগে থেকেই স্থূল প্রকৃতির হন তাদের ঝুঁকি বেশি থাকেযে সকল মহিলাদের গর্ভাবস্থায় ওজন বেড়ে যায় এবং আগে থেকেই যাদের অতিরিক্ত ওজন ছিল তাদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে
  • গর্ভাবস্থায় দ্রুত ওজন বৃদ্ধিঃ যদিও গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস এবং ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সঠিক সম্পর্কটি কি তা এখনো জানা যায়নি তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে ইনসুলিন উৎপাদন বিঘ্ন ঘটায় অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষগুলিতে কোনওরকম বাধা প্রদানের জন্য ইনসুলিন উৎপাদক হিসেবে কাজ করেবিটা কোষগুলির ইনসুলিন হরমোনের ক্ষরণের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের সৃষ্টি হয়
  • পারিবারিক চিকিৎসাগত ইতিহাসঃ যদি পারিবারিক চিকিৎসাগত ইতিহাসে ডায়াবেটিস টাইপ-II দ্বারা কেউ আক্রান্ত হন বিশেষত যদি ভাইবোন বা মায়ের মধ্যে এই অসুখটি থেকে থাকে,তাহলে হবু মায়ের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা মধুমেহ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়
  • পূর্ব গর্ভধারণের ইতিহাসঃ যদি আপনার আগের বারের গর্ভধারণের সময় ডায়াবেটিস হয়ে থাকে তাহলে আপনার রক্তে শর্করার পরিমাণ সঠিক রাখার জন্য আপনার ডাক্তারবাবু আপনাকে অবশ্যই কড়া নজরের মধ্যে রাখবেন, কারণ এক্ষেত্রে পুনরায় আপনার গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা প্রবল থাকে
  • বয়সঃ আপনার বয়স যদি 25 বা তার বেশি হয় তাহলে আপনার গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকেআসল কথা হল যত বেশি বয়স হবে ততই গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে
  • অন্যান্য শারিরীক অসুস্থতাঃ যে সকল মহিলার PCOS অথবা PCOS(পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম)এর ইতিহাস আছে তারা গর্ভবস্থার ডায়াবেটিসের শিকার বেশি হন কারণ এই অস্বাভাবিকতার জন্য শরীরে ইনসুলিন ক্ষরণের প্রতিবন্ধকতা বেড়ে যায়

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আমি কি কমাতে পারি?

আপনি যদি সেই শ্রেণীর মহিলাদের আওতায় পড়েন যারা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে থাকতে অথবা নাও থাকতে পারেন,সেক্ষেত্রেও আপনি গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারেনএটা সম্ভব আপনার ডায়েটের পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমেনিচে এব্যাপারে কয়েকটি পদক্ষেপের কথা আলোচনা করা হলঃ

  1. আপনার দৈনিক খাদ্য তালিকায় আরও বেশী করে খাদ্য তন্তু যোগ করুনঃ এটা আপনি করতে পারেন আপনার খাদ্য তালিকায় প্রচুর পরিমাণে হোল গ্রেইন বা সম্পূর্ণ শস্য,তাজা শাকসবজি এবং ফল যোগ করেপ্রতিদিনের খাবারে 10 গ্রাম করে তন্তুর পরিমাণ বৃদ্ধি করলে সেটি গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিসের ঝুঁকি 26% হ্রাস করে
  1. অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুনঃ মিষ্টি জাতীয় খাবার বর্জন করুন এবং সেই সব খাবারের পরিমাণ কমান যেগুলি শর্করা পূর্ণ বা যেগুলিতে শর্করার প্রাচুর্য আছেখাবারের চাহিদা মেটাতে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য থেকে দূরে থাকুন
  1. বারে বারে খানঃ খাবার খাওয়ার সংখ্যা বড়ান,অল্প করে কিন্ত বারে বারে খান একবারে অনেকটা খাবার খাওয়ার চেয়ে বারে বারে অল্প অল্প করে খান সেটা অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর ব্যাপার
  1. বুদ্ধিমত্তার সাথে পছন্দ করুনঃ নানা ধরনের খাবার খান যার ফলে আপনার দৈনিক খাদ্যে সব ধরনের পুষ্টির চাহিদা খুব সহজেই পূরণ হয়ে যায়
  1. আপনার প্রতিদিনের রুটিনে নিয়ম করে বিভিন্ন শারীরিক কাজকর্ম অন্তর্ভুক্ত করুনঃ কর্মক্ষম থাকলে আপনার গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম থাকেসাঁতার এবং হাঁটা এই দুটি করার জন্য গর্ভবতী মহিলাদের সব থেকে বেশি পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকেকিছু মাঝারি মানের ব্যায়াম আপনি করতে পারেন যেটি নির্ভর করবে আপনার শারীরিক এবং আপনার গর্ভাবস্থার সময় সীমার উপরসব সময় আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেবেন কি ধরনের ব্যায়াম আপনি করবেন সে সম্বন্ধে
  1. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুনঃ রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখার জন্য গর্ভধারণের আগে ও পরে দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরী

সাধারণ লক্ষণ এবং চিহ্নসমূহ

সেরকম ভাবে স্পষ্ট কোন চিহ্ন বা লক্ষণ নেই যার দ্বারা গর্ভবস্থায় ডায়াবেটিসকে সনাক্ত করা যায় তবে আপনার ডাক্তার বাবু আপনাকে আপনার গর্ভাবস্থার 24 থেকে 28 সপ্তাহের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন,কারণ এই সময়টি গর্ভবতী মহিলাদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিরূপণ করার সেরা সময় বলে বিবেচিত হয় উপরে বলা ঝুঁকিগুলি যদি আপনার থেকে থাকে তাহলে এই স্ক্রিনিং টেস্টটি আপনাকে আরো আগেই করে নেওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়, যাই হোক এখানে কিছু লক্ষণের উল্লেখ করা হলো যেগুলিকে আপনি সতর্কীকরণ হিসাবে ধরতে পারেন এবং সেগুলির থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য আপনাকে চিকিৎসাগত সহায়তা দ্রুত নিতে হবে

  • যথেষ্ট পরিমাণে জল বা তরল পান করা সত্বেও বারবার তেষ্টা পাওয়া
  • বারংবার মূত্রত্যাগ
  • খুবই দুর্বল লাগা(যদিও গর্ভাবস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিকে সাধারণত গর্ভবতী মহিলাদের দুর্বল লাগে তবুও যদি কম কাজকর্ম করা সত্ত্বেও অতিরিক্ত দুর্বল লাগে তাহলে সেটি গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের লক্ষণ হতে পারে)
  • মুখের ভিতরে শুষ্ক হয়ে যাওয়া
  • চোখে ঝাপসা দেখা
  • ঘন ঘন সংক্রমণ ঘটা

গর্ভাবস্থায় এই ধরনের সমস্যাগুলি সাধারণত গর্ভবস্থায় ডায়াবেটিসের ইঙ্গিত প্রদান করেগর্ভাবস্থা এবং ডায়াবেটিস দুটোই এক সাথে হবু মাকে অতিশয় ক্লান্ত করে তোলেসাধারণত গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ডায়াবেটিসের জন্য স্ক্রিনিং করা হয়ে থাকেযদি উপরে উল্লিখিত লক্ষণ গুলির তীব্র প্রকাশ আপনি আগেই দেখে থাকেন তাহলে অবশ্যই একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করে স্থির করা দরকার আপনার ডায়াবেটিসের স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন কিনা

গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিস কিভাবে গর্ভাবস্থাকে প্রভাবিত করে?

সাধারণত প্রসবের পর মায়ের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক মানে নেমে আসেযদিও বেশ কিছু ক্ষেত্রে নানারকম ঝুঁকি আছে গর্ভাবস্থায় সে সম্বন্ধে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়

  • প্রিক্ল্যাম্পসিয়াঃ গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস গর্ভস্থ সন্তান এবং মা দুজনেরই ক্ষতিসাধন করতে পারে,যদি এর চিকিৎসা না করা হয়সবথেকে সাধারণ যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটি হয়ে থাকে তা হল প্রিক্ল্যাম্পসিয়াএই অবস্থাটি সবথেকে বেশি দেখা যায় সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষ ত্রৈমাসিকে।প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার প্রধাণ দুটি বৈশিষ্ট্য হলো মূত্রে প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া যেটি একটি রুটিন চেক আপএর মাধ্যমে ধরা পড়ে এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়াযদি না ঠিকসময়ে চিকিৎসা করা হয় সেক্ষেত্রে অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠেএর ফলে অকাল প্রসব এবং খুব কম ক্ষেত্রে গর্ভপাত পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে
  • মৃতসন্তান প্রসবঃ গর্ভদশার 40 সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে মায়েরা যদি তাদের মধ্য গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস বয়ে নিয়ে চলেন তাহলে মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকিও বেড়ে যায়
  • টাইপ-II ডায়েবেটিস বিকাশ লাভ করেঃ বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মায়েদের ডায়াবেটিস টাইপII বিকাশ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়

সাধারণত অচিকিৎসাকৃত ক্ষেত্র উপরে উল্লিখিত সমস্ত জটিলতা গুলি ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলেগর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বিভিন্ন সমস্যাগুলিকে শুধুমাত্র বাড়িয়ে তোলেতবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক ডায়েট এবং নিয়মিত ব্যায়াম এটিকে প্রতিহত করে

গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিস কীভাবে গর্ভস্থ শিশুকে প্রভাবিত করে?

কোন কোন ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের প্রভাব মা অপেক্ষা শিশুর ওপর বেশি পড়েযখন আমরা বা প্ল্যাসেন্টা ইনসুলিনের কার্যকারিতার উপর প্রভাব বিস্তার করে তখন রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে সকল মায়েরা গর্ভবস্থায় ডায়াবেটিসের যথাযথ চিকিৎসা করিয়ে থাকেন তারা সাধারণত সুস্থ শিশুর জন্ম দেন, কিন্তু যদি গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিসকে ঠিকমতো চিকিৎসা না করা হয় তাহলে বাচ্চাদের মধ্যে নিম্নলিখিত প্রভাবগুলি দেখতে পাওয়া যায়ঃ

গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিস কীভাবে গর্ভস্থ শিশুকে প্রভাবিত করে?

  • ম্যাক্রোসোমিয়াঃ মায়ের রক্তে থাকা অতিরিক্ত শর্করা শিশুর দেহে স্থানান্তরিত হয়শিশুর রক্তে অতিরিক্ত শর্করার ফলে তার দেহে ইনসুলিন মাত্রা অধিক হয়এর ফলে ম্যাক্রসোমিয়া দেখা যায়,সেক্ষেত্রে ভ্রূণের ওজন 9 পাউন্ড বা তার বেশি হয় এইসব ক্ষেত্রে সি সেকশন(অস্ত্রোপচরার) করার প্রয়োজন হয়যদি স্বাভাবিক প্রসব করানো হয় তাহলে শিশুটির সামান্য ক্ষত অথবা জন্মগত ট্রমা বা শিশুটি সোল্ডার ডিস্টোশিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে
  • হাইপোগ্লাইসেমিক শিশুঃ যেসকল শিশুদের জন্মের সময় রক্তে শর্করার মাত্রা কম থাকে তাদের হাইপোগ্লাইসেমিক বলা হয়এটা সাধারণত রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বেশি থাকার জন্য হয়ে থাকে
  • শ্বাসকষ্টঃ গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়েদের যে সকল শিশু জন্মগ্রহণ করে তাদের অনেকের সামান্য শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা যায়এমনকি কারোর কারোর মধ্যে রেস্পিরেটারি ডিস্ট্রেস সিন্ড্রোম দেখা যায়, যেটির চিকিৎসা করা হয় জন্মের পরেই অতিরিক্ত অক্সিজেন প্রদানের মাধ্যমে
  • পুষ্টির অভাবঃ শিশুটির দেহে ম্যাগনেসিয়াম এবং ক্যালসিয়ামের মাত্রা কম থাকতে পারে যার ফলে তার মধ্যে খিঁচুনি বা টান বা ভীতভাব লক্ষ্য করা যায়যথাযোগ্য ফুড সাপ্লিমেন্ট বা খাদ্য পরিপূরকগুলির সাহায্যে এর চিকিৎসা করা হয়
  • জন্ডিসের ঝুঁকিঃ এইসব শিশুদের জন্মাবার পরেই জন্ডিস হওয়ার ঝুঁকি উচ্চমাত্রায় থাকেএটা খুব সহজেই চিকিৎসা করা যায় কিন্তু শিশুটি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েফলে শিশুটির অতি দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়
  • টাইপ টু ডায়াবেটিসঃ শিশু বড় হওয়ার সাথে তাদের মধ্যে টাইপ-II ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়

মনে রাখবেন এগুলি হল অবস্থার তীব্রতম রূপঅনেক ক্ষেত্রেই মায়ের ডায়াবেটিস দ্বারা শিশুটির কোনরূপ ক্ষতি হয় নাসব থেকে সুরক্ষিত উপায় হল সমস্যাটিকে যত দ্রুত সম্ভব চিহ্নিত করা এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে রাখা, যেটি শুধুমাত্র আপনার স্বাস্থ্য নয় আপনার শিশুটিকেও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিসের জন্য স্ক্রীনিং নির্দেশিকা

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের নিরূপণের পরীক্ষাটি করা হয়ে থাকে গর্ভদশার 24 থেকে 28 সপ্তাহের মধ্যেএক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তে শর্করার মাত্রা উচ্চ না নিম্ন তা জানার জন্য প্রধানত দুটি পরীক্ষা করা হয়ে থাকেপরবর্তীকালীন পরীক্ষানিরীক্ষা এবং স্ক্রিনিং টেস্ট করা হয়ে থাকে এর ফলাফলের উপর ভিত্তি করে

স্ক্রিনিং গ্লুকোজ চ্যালেঞ্জ টেস্ট(CGT)- উপবাসে না থেকে সঞ্চালনা পরীক্ষা

যে সকল পরীক্ষার্থী এই টেস্ট করতে আসেন তাদের একটি গ্লুকোজ দ্রবণ খেতে দেওয়া হয়।এক ঘন্টা পর তাদের রক্তের নমুনা নিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা নির্ণয় করা হয়অধিক মাত্রা রোগীর গ্লুকোজের সংশ্লেষণ ক্ষমতাকে সূচিত করে এবং তাকে OGTT করার পরামর্শ দেওয়া হয়

ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্টিং(OGTT)- উপবাসে পরিচালিত পরীক্ষা

এই পরীক্ষাটি করার জন্য রোগীকে খালি পেটে হাজির হতে হয়তার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং তাকে গ্লুকোজের একটি দ্রবণ খেতে দেওয়া হয়তারপর এক ঘণ্টা পরে তার দ্বিতীয় রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং দু ঘন্টা পরে তৃতীয় বার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়এই পরীক্ষাটি করতে দুঘণ্টা সময় লাগে এই সময়ের মধ্যে রোগীকে কোন কিছু খেতে বা পান করতে নিষেধ করা, একদম সঠিক ফলাফল নির্ণয় করতে সাহায্য করেযদি ফলাফল গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস এর সীমার মধ্যে পড়ে তাহলে তাকে প্রয়োজন মত ওষুধ খেতে অথবা ডায়েট ঠিক করতে পরামর্শ দেওয়া হয়

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের রোগ নির্ণয়

গর্ভবস্থার প্রথমেই ডাক্তারবাবু আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করে থাকেন তার চিকিৎসাগত এবং পারিবারিক চিকিৎসাগত ইতিহাস সম্পর্কে যাতে তিনি গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের শিকার হতে পারেন কিনা সে সম্বন্ধে একটি ধারণা করতে পারেনসম্পূর্ণ গর্ভকালীন সময় জুড়ে তিনি কোনওরকম সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখলে সেটিকে নিরীক্ষণ করেন এবং নজর রাখেনযদি কোনরকম অস্বাভাবিকতা দেখা না যায় তাহলে তিনি রুটিন চেক আপ করার পরামর্শ সঠিক সময় দিয়ে থাকেনএই পরীক্ষাটি গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসকে সনাক্ত করতে সাহায্য করে

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা

জীবন শৈলীর কয়েকটি সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনতন্তু সমৃদ্ধ কম কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাদ্য অল্প পরিমাণে বারে বারে গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার মাত্রা কম রাখতে সাহায্য করে।OGTT এর ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ডাক্তারবাবু আপনাকে হালকা ব্যায়াম করার পরামর্শ দিতে পারেনকিছুদিনের বিরতির পর আবার রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে কোনওরকম পরিবর্তন হয়েছে কিনা তা জানতেযদি সেটির মাত্রা স্বভাবিক মানে নেমে আসে তাহলে আপনাকে শুধুমাত্র আপনার ডায়েট এবং ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শই দেওয়া হবেআপনার ডাক্তারবাবু আপনার গর্ভস্থ শিশুর শারিরীক সুস্থতা ও নির্দিষ্ট সময় সূচী অনুযায়ী পরীক্ষা করবেনযদি আপনার রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে না আসে তাহলে ডাক্তারবাবু আপনাকে ঔষধ অথবা ইনসুলিনের শট নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন

কীভবে গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়

সবথেকে সহজ উপায় হল আপনার ডায়েটের দিকে নজর দেওয়াআপনি কি খাচ্ছেন আর কখন খাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে যে,গর্ভদশা চলাকালীন আপনার সাধারণ স্বাস্থ্য কেমন যাবে

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের ডায়েটের পরিকল্পনা

এখানে রইল আপনার ডায়েটের পরিকল্পনাটি কেমন হতে পারে তার একটি নমুনাঃ

প্রাতঃরাশ মধ্যাহ্নভোজ নৈশভোজ
পছন্দ অনুযায়ী 2 থেকে 3 ধরণের কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য(30 থেকে 45 গ্রাম) পছন্দ অনুযায়ী 3 থেকে 4 ধরণের কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য(45 থেকে 60 গ্রাম)
পছন্দ অনুযায়ী 3 থেকে 4 ধরণের কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য(45 থেকে 60 গ্রাম)
প্রোটিন(মাংস,পোল্ট্রিজাত খাদ্য,মাছ,ডিম,চীজ,মটরশুঁটিমাখন) প্রোটিন (মাংস,পোল্ট্রিজাত খাদ্য,মাছ,ডিম,চীজ,মটরশুঁটি,মাখন)
প্রোটিন (মাংস,পোল্ট্রিজাত খাদ্য,মাছ,ডিম,চীজ,মটরশুঁটি,মাখন)
সবুজ শাকসবজি অথবা স্নেহ পদার্থ বিহীন খাদ্য সবুজ শাকসবজি অথবা স্নেহপদার্থ বিহীন খাদ্য
সবুজ শাকসবজি অথবা স্নেহপদার্থ বিহীন খাদ্য
সকাল বেলার
জলখাবার
দুপুরের
জলখাবার
সন্ধ্যার
জলখাবার
পছন্দ অনুযায়ী 1 থেকে 2 ধরণের কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য(15-30গ্রাম) পছন্দ অনুযায়ী 1 থেকে 2 ধরণের কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য(15-30গ্রাম)
পছন্দ অনুযায়ী 1 থেকে 2 ধরণের কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য(15-30গ্রাম)
প্রোটিন (মাংস,পোল্ট্রিজাত খাদ্য,মাছ,ডিম,চীজ,মটরশুঁটি,মাখন) প্রোটিন (মাংস,পোল্ট্রিজাত খাদ্য,মাছ,ডিম,চীজ,মটরশুঁটি,মাখন)
প্রোটিন (মাংস,পোল্ট্রিজাত খাদ্য,মাছ,ডিম,চীজ,মটরশুঁটি,মাখন)
সবুজ শাকসবজি অথবা স্নেহপদার্থ বিহীন খাদ্য সবুজ শাকসবজি অথবা স্নেহপদার্থ বিহীন খাদ্য
সবুজ শাকসবজি অথবা স্নেহ পদার্থ বিহীন খাদ্য

সুত্রঃ https://www.allinahealth.org/health-conditions-and-treatments/health-library/patient-education/gestational-diabetes/healthy-eating-physical-activity-stress-management/basic-meal-planning/

আপনার পুষ্টিবিদ আপনার পছন্দের স্বাদ অনুযায়ী একটি ব্যাক্তিগত ডায়েট চার্ট তৈরী করে দিতে পারেন

গর্ভবতী মহিলাদের রক্তে শর্করার মাত্রা

রক্তে গ্লুকোজের আদর্শ মাত্রা যেসকল মহিলাদের গর্ভবস্থার পূর্বে ব্লাড সুগার ছিল আর যাদের গর্ভবস্থায় ডায়েবেটিস হয়েছে তা অবশ্যই ভিন্ন প্রকৃতির হয়এখানে গর্ভদশা চলাকালীন রক্তে শর্করার মাত্রার একটি সাধারণ নির্দেশিকা দেওয়া হলঅবশ্যই মনে রাখবেন প্রতিটি গর্ভাবস্থাই আলাদা এবং আপনার ডাক্তার বাবুই হলেন একমাত্র ব্যাক্তি যিনি আপনার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সঠিক পরামর্শদাতা

সূত্রঃ http://www.webmd.com/diabetes/gestational-diabetes-guide/normal-blood-sugar-levels-chart-pregnant-women.

কীভাবে একজন গর্ভাবস্থাকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে পারেন?

প্রতিরোধের প্রথম পর্যায়টি হল যাবতীয় পূর্ববর্তী তথ্যগুলো সংগ্রহ করাএর ফলে আপনি শুধুমাত্র কি কি ঝুঁকির শর্তগুলি এর মধ্য আছে সে সম্বন্ধেই জানবেন না,আবার ভবিষ্যতে আপনার কি হতে পারে সেই ব্যাপারেও আপনাকে তৈরী করতে এটি সাহায্য করেআপনি ডাক্তারবাবুকে আপনার চিকিৎসাগত ইতিহাসটি ব্যক্ত করুন এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে ডায়াবেটিসের বিভিন্ন স্ক্রীনিং টেস্টগুলি প্রথম ধাপে করিয়ে ফেলুনআপনার ডায়েটের এবং নিয়মিত ব্যায়ামের ব্যাপারে কঠোর থাকুন যা আপনার জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে যা গর্ভাবস্থায় আপনার রক্তে শর্করার স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করবেমিষ্টি খাওয়ার তীব্র বাসনা অনেক গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রেই দেখা যায় কিন্তু মনে রাখবেন অস্বাস্থ্যকর মুখরচক স্ন্যাকস জাতীয় খাদ্যগুলি এবং উচ্চমাত্রার শর্করা জাতীয় খাবারগুলি ভাল করার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে

প্রসবের পর মা এবং শিশুর কি হয়?

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিছুই হয় না!মায়েরা সাধারণত তাদের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যকর শারীরিক অবস্থানে ফিরে যান, তাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে গিয়ে স্বাভাবিক হয়ে যায় আর সদ্যোজাত সন্তানরা সুস্থ, স্বাস্থ্যকর ও সুখী থাকেকিন্তু খারাপ ক্ষেত্রগুলিতে রক্তে উচ্চশর্করার মাত্রা থাকার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়,সেটি আবার অনেক পরে ধরা পরতে পারে কিম্বা মায়ের শরীরে ওষুধের কোনো প্রতিক্রিয়া না হওয়ার ফলে মা এবং শিশু উভয়েই এর দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেনবেশ কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় মা টাইপ-II ডায়বেটিস এবং শিশুটি হাইপোগ্লাইসিমিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে কিনা

প্রসবের পরেও দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে,স্বাস্থ্যকর ডায়েট,ও নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস বজায় রাখতে হবেযা পরবর্তী জীবনে অথবা পরবর্তী গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়কখনই প্রসব পরবর্তীকালীন আপনার এবং আপনার সন্তানের চিকিৎসা সংক্রান্ত সেশনগুলো এড়িয়ে যাবেন না। স্তনদুগ্ধ পান করানোর সাথে সাথে আপনি আপনার সঠিক পুষ্টিপূর্ণ খাদ্যগ্রহণের ব্যাপারটিকেও নিশ্চিত করবেনএটি মায়েদের সঠিক ওজন বজায় রাখার পাশপাশি মায়েদের এবং শিশুর সুস্বস্থ্য নিশ্চিত করে