ষষ্ঠ মাসের গর্ভাবস্থায় ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস (21-24 সপ্তাহ)

ষষ্ঠ মাসের গর্ভাবস্থায় ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস (21-24 সপ্তাহ)

আপনি আপনার গর্ভাবস্থার ষষ্ঠতম মাসে পদার্পণের সাথে লক্ষ্য করবেন যে,আপনার উন্নয়ণশীল শিশুর কার্যকলাপ এবং বিশ্রাম আরও বেশী রুটিন অনুযায়ী হতে থাকে।এদিকে আবার আপনি আপনার নিজের শরীরের নানান উপসর্গগুলির অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন যেমন হাত এবং পা ফুলে যাওয়া থেকে পিঠের নিম্নস্থলে যন্ত্রণা,গ্যাস্ট্রিক সমস্যা,যোনির স্রাব বেড়ে যাওয়া এবং এমনকি মাড়ি থেকে রক্তপাতের মত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়।

aniview

6 মাসের গর্ভাবস্থায় খাদ্যাভ্যাসে অন্তর্ভূক্ত খাদ্যসমূহ

এই সময় থেকে আপনি ঘন ঘন এবং তীব্রএই উভয় প্রকারেই এমন খিদে পাওয়ার অভিজ্ঞতা পেতে শুরু করেছেন যা এর আগে কখনই পান নি।6 মাসের গর্ভাবস্থায় কি কি খাবার খাওয়া যেতে পারে এখানে তার একটা তালিকা লিপিবদ্ধ করা হল।

1.ভিটামিন C

গর্ভাবস্থার এই পর্যায়ে আপনার শরীরে উচ্চ রক্তের পরিমাণ থাকার কারণে, আপনি আপনার মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার অভিজ্ঞতার সামিল হতে পারেন।যদি অবস্থার আরো অবনতি হতে থাকে,এটি জিনজিভাইটিস যা হল মাড়ির সমস্যা বা মুখে ঘা হতে পারে।গর্ভাবস্থার এই মাসে বেশী পরিমাণে ভিটামিন C গ্রহণ করুন, যেহেতু এটি সমগ্র শরীরের যোজক কলার যার মধ্যে আবার দাঁতগুলিকে মাড়ির সাথে এবং চোয়ালের হাড়ের সাথেও বাঁধনে সাহায্যকারী কলাটিও অন্তর্ভূক্ত ,মেরামতের জন্য এবং সেগুলি কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।

সাইট্রাস ফল যেমন কমলা লেবু, সরবতী লেবু এবং ট্যাঞ্জেরাইন অর্থাৎ ছোট একধরণের কমলা লেবু বিশেষ এগুলি ভিটামিন C এ সমৃদ্ধ।এছাড়াও ভিতামিন C এর অন্যান্য উৎসগুলি হল স্ট্রবেরী,আঙুর,বাঁদাকপি এবং মিষ্টি আলু।

2. শাকসবজি

আপনার গর্ভাবস্থার অগ্রগতীর সাথে সাথে আপনি আরও কোষ্ঠকাঠিন্য এবং বদহজম সংক্রান্ত বিষয়গুলির সহিত জড়িয়ে পড়তে থাকেন।কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষায় দেখা গেছে যে,প্রায় 85% মহিলা গর্ভাবস্থা চলাকালীন সময়ে অর্শের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।যে সকল শাকসবজিতে প্রচুর তন্তু থাকে সেগুলি 6 মাসের গর্ভাবস্থায় খাদ্য তালিকা্য় অন্তর্ভূক্ত করা অপরিহার্য অংশ যেহেতু এতে ভুষির পরিমান বেশী থাকে তাই এটি অন্ত্রের সঞ্চালন কে স্বাভাবিক রাখে।

3.রল

মনে রাখবেন একজন গর্ভবতী মা হিসাবে আপনি দুইজনের জন্যে খাচ্ছেন এবং দুই জনের জন্যই পান করতে হবে।জলের চাহিদা মেটানোর জন্যে আপনাকে কমপক্ষে 8 গ্লাস জল পান করতে হবে প্রতিদিন।এরসাথে কিছু পরিমান জুসি খাবার খেতে হবে। শরীরে জলের পরিমাণ ঠিক রাখার বিষয়টি খুব কম আলোচিত হয় যখন আমরা 6 মাস বয়সী গর্ভবতী মহিলাদের খাবারের বিষয়টি আলোচনা করি।কোষ্ঠকাঠিণ্যের সাথে লড়াই করতে হলে প্রচুর পরিমানে পান করুন।

4.ফোলিক অ্যাসিড

ফোলিক অ্যাসিড হল একটি জটিল ভিটামিন।এটা নতুন কোষ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপাদান।এটা অত্যন্ত জরূরী যেসকল খাদ্য ফোলিক অ্যাসিডের উৎস তাদের অবশ্যই খাওয়া দরকার।দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে গর্ভস্থ ভ্রূণের দ্রুত বিকাশ লাভ ঘটে থাকে 24তম সপ্তাহের শেষের দিকে।

যেসব খাদ্য ফোলিক অ্যা সিডে ভরপুর সেগুলো হল গমের আটার রুটি, দানাশস্য, সবুজ শাক সবজি(ব্রকোলি, লেটুস, শাকপাতা)শণের বীজ,সূর্যমুখী বীজ,কুমড়ো, তিলের বীজ মটর বীজ এবং আমন্ড।এটা বিভিন্ন ফল যেমন ওক্রা, মটর,আঙ্গুর এবং কলাতে পাওয়া যায়।

5.প্রোটিন

কোষের ব্লক গঠণের জন্য প্রোটিন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।প্রটিন কার্বহাইডের মত সহজে ফ্যাটে পরিণত হয়ে ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে না।দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম এবং চর্বি বিহীন সাদা মাংস।অন্যান্য ভারতীয় রন্ধণপ্রণালী যেমন সীম এবং ডালে প্রচুর পরিমান প্রোটিন থাকে।

6.কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা

প্রোটিনের মত কার্বো হাইড্রেট অত্যন্ত জরূরি খাদ্য উপাদান প্রতিদিনের জীবনে।শর্করা শরীরের মধ্যে বিপাক প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করে।অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট ফ্যাটে পরিণত হয় এবং কোষের মধ্যে জমা থাকে।

পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট যেমন পালীশ করা চাল(তুষ ছাড়া)এবং সাদা রুটি খুব সহজেই দ্রুত ভেঙে গিয়ে সুগার(সরল শর্করায়) পরিণত হয় এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি করে।এটা খুব ভাল সব সময়ে পূর্ন দানার আটার রুটি এবং বাদামী চালের(ব্রাঊন রাইস)ভাত এর উপর আস্থা রাখুন।গম, ওটমিল এবং দানাশস্য গুলি হল কার্বোহাইড্রেটের ভাল উৎস।

7. ফল

নানা ধরনের ভিটামিন,মিনারেল(খণিজ পদার্থ)এবং প্রয়োজনীয় ভুষি বা তন্তু পরিপাকে সাহায্য করে যা ফলে থাকে।যেহেতু বেশীরভাগ ফলেই প্রচুর পরিমাণে জল থাকে তাই ফল আমাদের জলের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে।

প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরণের ফল গ্রহণ করলে আপনার প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের চাহিদা পূরণ হবে।উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যেমন ন্যাসপাতিতে আছে ফসফরাস,ভিটামিন C,পটাসিয়াম এবং তামা।, আপেলে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট,B-কমপ্লেক্স, লোহা, এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট;কলাতে আছে পটাসিয়াম,B-6 ভিটামিন এবং ভিটামিন C ইত্যাদি।

ছয় মাসের গর্ভাবস্থায় এড়িয়ে চলতে হবে যে খাদ্যগুলি

এখানে এমন কিছু খাবারের উল্লেখ করা হল যেগুলি আমাদের সাধারণ খাদ্যতালিকার অংশ বিশেষ কিন্তু সেগুলিই আবার আপনার এবং আপনার সন্তানের স্বাস্থ্যের উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে আপনার গর্ভাবস্থাকালীন সময়ে

1.সামুদ্রিক খাবার

গর্ভবতী মায়েদের থেকে জানা গেছে যে তাদের সামুদ্রিক কাঁচা খাবার যেমন সুশি খাওয়ার ইচ্ছের কথাবেশীর ভাগ সামুদ্রিক খাবারেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মার্কারি থাকে,কারণ যৌগটিতে থাকা মার্কারি (মিথাইলমার্কারি) লবণাক্ত জলে সহজে দ্রবীভূত হয় না কিন্তু মিষ্টি জলে জায়মান ক্রিয়ার ফলে সেগুলি ভেঙে যায়যদিও বড়দের দেহে সামান্য পরিমাণে মার্কারি কোনও খারাপ প্রভাব নাও ফেলতে পারে,তবুও গর্ভাবস্থায় এটির সংসর্গ এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভাল কারণ আপনার সন্তানের মস্তিষ্কের ব্রেন তখনও বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে

2.ক্যাফিন

উচ্চ মাত্রায় ক্যাফিন গ্রহণ নবজাতকের নিদ্রাহীনতা এবং বিশ্রামহীনতার সাথে সম্পর্কিতমায়েদের ক্যাফিন গ্রহণের ফলে ভ্রূণের হৃদ স্পন্দনের মাত্রা বেড়ে যাবে এবং তাদের নির্ভরতার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবেযেহেতু ভ্রূণে এই সময়ের মধ্যে বিষক্রিয়া নাশ করার কোনো তন্ত্র গড়ে ওঠে না তার ফলে ক্যাফিন তাদের শরীরে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের থেকে অনেক বেশী সময় ধরে থেকে যায়

3.সয়া

সয়া এবং কিছু ভেষজের মধ্যে ফাইটোইস্ট্রোজেন নামক যৌগটি থাকে যা গর্ভধারণের ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলেফাইটোইস্ট্রোজেন সাধারণ ইস্ট্রোজেনের ভূমিকা নেয় এবং ইস্ট্রজেন গ্রাহকের সাথে বন্ধন গঠন করেযে সকল মহিলা সন্তান ধারণ করতে চাইছে তাদের জন্য এটি অত্যন্ত উপযোগীযাইহোক,যদি আপনি আগে থেকেই গর্ভবতী হয়ে থাকেন তাহলে এটি আপনার গর্ভস্থ শিশুর উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেতার ব্রেন,জননাঙ্গ এবং ইমিউন সিস্টেমের ক্ষতিসাধন করে

4.ফাস্টফুড

অনেক গর্ভবতী মহিলার কছ থেকে জানা যায় যে,হঠাৎ করে তাদের ফাস্ট ফুড খাবারের উপর আকর্ষণ বেড়ে যায়আসলে অনেক সাধারণ মানুষ, পুরুষ বা মহিলা গর্ভবতী বা তা নন আকস্মিক ফাস্ট ফুডের উপর আকর্ষণ অনুভব করেনফাস্ট ফুডে থাকা প্রচুর পরিমাণ ক্যালোরি আপনার রক্তের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটায় এবং পরে আচকা তা আবার কমে যায়এই চরম অবস্থা বিরক্তি,অবসাদকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং পরবর্তী কালে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির ক্ষতি করে

ফাস্টফুড জেস্টিন্যালডায়বেটিস‘, যা হল গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি ঘটিয়ে থাকেএটি যদি চেক করা না হয় তবে তাদের সন্তানদের মধ্যেও চিরস্থায়ী সমস্যায় পরিণত হবে

5.ঠিকমত রান্না হয়নি এমন মাংস

সবসময়েই নিশ্চিত হয়ে মুরগীর মাংস বা অন্য কোনো মাংস খাবেন যেন সেটা ভালভাবে রান্না করা হয়েছে।যদি ঠিক্মত রান্না করা নাহয় তাহলে লিস্টেরিয়া ব্যাকট্রিয়াম নামক ব্যাক্টেরিয়া যা মাংসে থাকে তা আপনার শরীরে প্রবেশ করে লিস্টেরিওসিস নামক রোগ সৃষ্টি করে।লিস্টেরিওসিস হল খাদ্য বিষ্ক্রিয়া জনিত একটি রোগ যেটি শাক সবজি, ঠিক্মত রান্না না হওয়া মাংস এবং পাস্তুরাইজ করা হয়নি এমন দুগ্ধজাত খাদ্যদ্রব্য থকে হতে পারে।এর ফলে গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে।

6.মশলাদার খাবার

মশলাদার খবার আপনার গর্ভস্থ বিকাশমান শিশুর ক্ষেত্রে অসুরক্ষিত নয়।যাইহোক গর্ভাবস্থার শেষের দিকের পর্যায়ে এটি হৃদয় প্রদাহক,হজমের অসুবিধা এবং সাধারণ অস্বস্তি যেগুলো একজন গর্ভবতী মহিলার দেখা যায় তা বাড়তে পারে।

7. অ্যালকোহল এবং তামাক

এটা সবাই জানে যে অ্যালকোহল এবং তামাক সম্পূর্ণ ভাবে বর্জন করা উচিত গর্ভাবস্থায়।এই ড্রাগগুলো গর্ভধারণ করতে চাইছেন তখন থেকেই বর্জন করা উচিত।এই ড্রাগ গুলো আপনার গর্ভস্থ ভ্রূণের ভয়ঙ্কর ক্ষতি করতে পারে।

6 মাসের গর্ভবতী মহিলার জন্য খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ

  • ওষুধের উপর পালটা ওষুধ নেওয়া এড়িয়ে চলুন
  • যদি নিয়মিত কোনো ওষুধ খাওয়ার থাকে তবে সেটা খান,তবে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে আপনার গর্ভাবস্থায় সেগুলি ব্যবহারের বিষয়ে আপনার ডাক্তারবাবুর সাথে আলোচনা করে নেবেন
  • খিদে পাওয়া হল গর্ভাবস্থার একটা প্রাকৃতিক অংশ! খিদে নিবারণের জন্য ফল এবং সবজির মত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন
  • গর্ভাবস্থার সময় এবং অন্যান্য সময় সাধারণ ফাস্ট ফুডগুলি খাওয়ার ইচ্ছে হওয়াটা স্বাভাবিকএই ধরণের খিদের ইচ্ছেটা সপ্তাহে কেবলমাত্র এক বা দু বার পূরণ করুন এবং চেষ্টা করুন সেটাকে আরো কিছু অংশে কমাতে
  • খিদের ইচ্ছেকে সন্তোষজনক ভাবে মেটানো কঠিন কাজফাস্ট ফুড বা তেলে ভাজা খাবার অথবা চর্বিযুক্ত ভারী খাবারের কিছুটা অংশ খাওয়া শেষ করার সাথে সাথেই যেন পুনরায় আপনার খাবারের থালাটি সম্পূর্ণ শেষ করে ফেলবেন নাবসুন এবং 4 মিনিট বা তার কিছু বেশী সময় ধরে অপেক্ষা করতে পারেন আপনার পুনরায় খাওয়ার ইচ্ছেটাকে দমন করার জন্য,যেহেতু আপনার পেট আপনার মাথাকে সংকেত পাঠাতে কিছুটা সময় নেয় যে এটি পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং আর কোনো অতিরিক্ত খাবারের প্রয়োজন নেই

একটা সুষম খাদ্যাভ্যাস একজন মায়ের সুস্থতাকে বজায় রাখে আর একজন সুস্থ মা একটি সুস্থ শিশুকে গড়ে তোলে