স্কুল-শিক্ষার জন্য সরকারী প্রকল্পগুলি যেগুলি সম্পর্কে মা-বাবাদের জানা উচিত

স্কুল-শিক্ষার জন্য সরকারী প্রকল্পগুলি যেগুলি সম্পর্কে মা-বাবাদের জানা উচিত

অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক এবং সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে শিক্ষা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।একবিংশ শতাব্দীতে,সমাজের সার্বিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন প্রাসঙ্গিক দক্ষতা,মানসিকতা এবং জ্ঞানে সমৃদ্ধ সুশিক্ষিত এক জনগোষ্ঠীর। একটি ন্যায়সঙ্গত সমাজ গঠণে শিক্ষা একটি মূখ্য ভূমিকা পালন করে।

aniview

ভারতের জনসংখ্যা হল প্রায় 1.32 বিলিয়ন।ক্রমবর্ধিত প্রয়োজন এবং চাহিদার ভিত্তিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে বহু বছর ধরে অসংখ্য পরিবর্তন হয়ে আসছে।ভারতে শিক্ষার মান ক্রমশ উন্নত হয়ে উঠছে এবং উচ্চ মানের শিক্ষার দ্বারা অনেক শিশুই বেশ উচ্চ মানের নম্বরও অর্জন করছে।আর এর পিছনে থাকা কারণটি হল শিশুদের লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করতে সরকারের চালু করা বিভিন্ন প্রকল্প,যেগুলি তাদের আরও ভাল সুযোগ সুবিধা প্রদানে সাহায্য করে।সেগুলি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মান এবং শিক্ষার ধরণে উন্নতির লক্ষ্যে অনেক পরিবর্তন বাস্তবায়ন করেছে।অনেক রাজ্য সরকার কিছু সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে বিদেশী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে পাঠানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন,তাদের মধ্যস্থ জ্ঞান এবং দক্ষতায় সর্বাধুনিক রূপ আনয়নের ক্ষেত্রে এবং তাদের শেখানোর মানকে আরও উন্নত করে তোলার জন্য।

শিশুদের স্কুলে যেতে এবং শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করে এমন প্রকল্পগুলি

শিশুদের স্কুলে যেতে এবং শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করে এমন প্রকল্পগুলি

সার্বজনীনরূপে প্রাথমিক শিক্ষার্জনের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রকল্প এবং কর্মসূচীগুলি শুরু করেছেন।শিক্ষার জাতীয় নীতিমালার নীতিগুলি মেনে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছেন যা সকলের জন্য ন্যায্য শিক্ষা নিশ্চিত করে।এই সকল প্রকল্পগুলির মূল লক্ষ্য হল শিক্ষার মানকে উন্নত করা এবং শিক্ষার মৌলিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটানোর জন্য ভাল বিদ্যালয়গুলি সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিক্ষার মানকে উন্নীত করা।এখানে ভারতের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য গ্রফণ করা বেশ কয়েকটি প্রকল্পের উল্লেখ করা হলঃ

1. সর্ব শিক্ষা অভিযান(SSA)

এই কর্মসূচীটি ভারতবর্ষে 2001 সালে অনুসৃত হয়েছিল,এবং ভারতবর্ষের বৃহত্তম প্রকল্পগুলির মধ্যে এটি একটি।সর্ব শিক্ষা অভিযান হল শিশুদের সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা(UEE)পাওয়ার একটি প্রধান কর্মসূচী।এই কর্মসূচীটি সমগ্র দেশের জন্যই প্রযোজ্য এবং এটি স্থানীয় এবং রাজ্য সরকারগুলির সাথে অংশীদারিত্বে কাজ করে।SSA মূলত 6-14 বছরের মধ্যে থাকা শিশুদের জন্য কার্যকর।এই কর্মসূচীর লক্ষ্য হল সার্বজনীন শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং সময়সীমার মধ্যে তা বাস্তবায়নের কৌশল এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রূপায়ণের দ্বারা শিক্ষার গুণমানকে উন্নত করে তোলা।আর এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে সমাজের সকল শ্রেণীর শিশুরা।

2. প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের শিক্ষার জন্য জাতীয় কর্মসূচী(NPEGEL)

NPEGEL এর কর্মসূচীটি মেয়েদের জন্য বিশেষত বিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়া মেয়েদের কাছে শিক্ষা পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ভারত সরকার চালু করেছিলেন। এই কর্মসূচীটি শুরু হয়েছিল 2003 সালের জুলাই মাসে এবং এই কর্মসূচীটি হল SSA এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশস্বরূপ।এই কর্মসূচীটিতে মেয়েদের শিক্ষার উন্নতির জন্য অতিরিক্ত সমর্থন সরবরাহ করা হয়।এই প্রকল্পের অধীনে আসা কয়েকটি উদ্দেশ্য হল শিক্ষার উপকরণের উন্নতিকরণ, যেগুলি্র মধ্যে রয়েছে লিঙ্গ সংবেদনশীল,শিক্ষকদের লিঙ্গ সংবেদনশীলতা,পেন-স্কেল-রবার-পেন্সিলের মত স্স্টেশনারি পণ্যগুলির সরবরাহ,বিদ্যালয়ের পোশাক এবং খাতা-বইয়ের যোগান।এই কর্মসূচীর মূল লক্ষ্য হল লিঙ্গ-ছকের বেড়া ভেঙে প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের শিক্ষাকে আরও এগিয়ে নিয়ে উন্নত করে তোলা নিশ্চিত করা।

প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের শিক্ষার জন্য জাতীয় কর্মসূচী(NPEGEL)

3. মিডডে মিল প্রকল্প

অন্যভাবে এটি আবার প্রাথমিক শিক্ষায় পুষ্টির সমর্থনে গ্রহণ করা জাতীয় কর্মসূচী হিসেবেও পরিচিত।বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শ্রেণীগুলিতে পড়া শিশুদের মিডডে মিল বা মধ্যাহ্নভোজ দেওয়ার উদ্দেশ্যে 1995 সালে এই পরিকল্পনাটি শুরু করা হয়েছিল।এই প্রকল্পটি গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্যটি ছিল শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষুধা নিবৃত্তি করা এবং বিদ্যালয়ে শিশুদের নাম নথিভূক্ত করার সংখ্যা বাড়ানোর দ্বারা শ্রেণীকক্ষে তাদের উপস্থিতির হারকেও বাড়িয়ে তোলা।এছাড়াও আবার এই প্রকল্পের আরও একটি লক্ষ্য হল সকল বর্ণ ও ধর্মের শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকেও উন্নত করে তোলা।এটি আবার শিশুদের অপর্যাপ্ত এবং অনুপযুক্ত পুষ্টি সংক্রান্ত সমস্যাগুলি সমাধানের ক্ষেত্রেও সুরাহা নিয়ে আসে।প্রকল্পটি কর্মসংস্থানের কিছু সুযোগ সৃষ্টি করার কারণে নারীরাও আবার এই সূত্রে সামাজিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে ওঠার সুযোগ পান।অতএব,এই প্রকল্পটি শিশুদের সামাজিক এবং মানসিকভাবে ক্রমবিকশিত করে তোলার ক্ষেত্রেও সহায়তা করে চলেছে।

মিডডে মিল প্রকল্প

4. শিক্ষার অধিকার আইন(RTE)

এটি সরকার কতৃক গৃহীত আরেকটি দুর্দান্ত পদক্ষেপ।শিক্ষার অধিকার আইনটি চালু করা হয় 2009 সালে এবং এই আইনটি তৈরী হয়েছিল 6-14 বছরের মধ্যে থাকা প্রতিটি শিশুর শিক্ষার মৌলিক অধিকারের জন্য।আমাদের দেশের সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিকে আবশ্যিকভাবে মেনে চলতে হবে এমন কিছু প্রাথমিক নিয়মগুলি এটিতে স্থির করা হয় আর তার ফলে শিশুরা বিনামূল্যে মৌলিক শিক্ষা অর্জনের অধিকার পায়।অর্থাৎ এর অর্থ হল প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা সম্পূর্ন করার জন্য কোনও শিশুকেই কোনও রকম ফী বা মূল্য ব্যয় করতে হবে না।RTE আইনটি আবার এমন এক কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রমের বিকাশে লক্ষ্য রাখে যা শিশুদের জ্ঞান,প্রতিভা এবং সম্ভাবনাকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার সার্বিক বিকাশের সুবিধাগুলি অর্জনকে নিশ্চিত করে তোলা।বেসরকারী বিদ্যালয়গুলিতে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল বা দুর্বল পরিবারগুলি থেকে আসা শিশুদের জন্য শিক্ষার অধিকারের আইনটি 25% সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করেছে।

শিক্ষার অধিকার আইন(RTE)

5. বেটি বাঁচাও,বেটি পড়াও

মেয়েদের শিক্ষার জন্য 2015 সালে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত একটি অন্যতম জনপ্রিয় প্রকল্প এটি।এই সরকারী প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য ছিল ভ্রূণহত্যা এবং শিশু হত্যার হাত থেকে কন্যা শিশুদের রক্ষা করা এবং পরবর্তীতে তাদের শিক্ষাক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করা।এই পরিকল্পনার অন্যান্য দিকগুলির মধ্যে রয়েছে লিঙ্গ নির্ধারণ পরীক্ষাগুলি করানো বন্ধ করা এবং শিশু কন্যাদের প্রতি যেকোনও বৈষম্য রোধ করা।’বেটি বাঁচাও,বেটি পড়াও’ প্রকল্পটি মেয়েদের জীবন সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং শিক্ষামূলক ক্রিয়াকলাপে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরদেরও অংশগ্রহণ করার বিষয়টিকে নিশ্চিত করে।অর্থাৎ শিশু কন্যারা যে বোঝা নয়-এই সতর্কতাটিকে সমাজে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ‘বেটি বাঁচাও,বেটি পড়াও’ প্রকল্পটি মূখ্য ভূমিকা পালন করে।

বেটি বাঁচাও,বেটি পড়াও

6. কস্তুরবা গান্ধী বালিকা বিদ্যালয়

2004 সালে প্রবর্তিত KGBV প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল নিম্ন সম্প্রদায়ে বসবাসকারী বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েদের উচ্চ প্রাথমিক স্তরে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আবাসিক বিদ্যালয়গুলি স্থাপন করা।এই প্রকল্পটি মূলত দেশের সেই সকল অংশে প্রবর্তিত করা হয় যেখানকার মেয়েরা বিদ্যালয়ে তাদের নাম নথিভুক্ত করায় না বা করানোর সুযোগ পায় না।এই প্রকল্পটি দেশে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মেয়েদের 25% এবং ST,SC,OBC এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েদের ক্ষেত্রে বাকি 75% সংরক্ষণ করে।এই প্রকল্পটির পিছনে থাকা মূল ধারণাটি হল আবাসিক বিদ্যালয়গুলি স্থাপনের মাধ্যমে সমাজের সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত মেয়েদের উচ্চ মানের শিক্ষা গ্রহণের পথে প্রবেশ করতে পারার সুযোগ প্রদান করা।

কস্তুরবা গান্ধী বালিকা বিদ্যালয়

7. সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রকল্প(স্কীম ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভলপমেন্ট ইন মাইনরিটি ইন্সটিটিউট IDMI)

শিক্ষার মানের উন্নতি ঘটাতে,বিনা সহায়ক/সহায়তা প্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য এই প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল।এই প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত কিছু সুবিধা যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।এই প্রকল্পের অধীনে যদিও গোটা দেশটাই আসে তবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় সেই সকল জায়গাগুলিকেই যেখানে সংখ্যালঘু জনবসতি 20% উপরে রয়েছে।এই প্রকল্পটি আবার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের,মেয়েদের এবং সমাজে পিছনের শ্রেণীতে থাকা অন্যান্যদের জন্য শিক্ষামূলক সুযোগ-সুবিধাগুলি প্রদানের ক্ষেত্রেও উৎসাহ যোগায়।

সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রকল্প(স্কীম ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভলপমেন্ট ইন মাইনরিটি ইন্সটিটিউট IDMI)

সাম্প্রতিক দশকগুলিতে,এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের ফলে বিদ্যালয়গুলিতে শিশুদের প্রবেশ করা সহজতর হয়েছে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হারও আগের তুলনায় আরও অনেক বেশি বেড়েছে।এর ফলে আবার ভারতবর্ষে বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার হারেও হ্রাস দেখা গেছে।ভারতবর্ষে মূলত এই সকল কর্মসূচীগুলি রূপায়ণের কারণেই আজ সর্বত্র এমনকি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতেও প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে সাফল্যের ছবি দেখা যাচ্ছে।