গর্ভাবস্থায় গ্যাস এবং পেট ফাঁপা

গর্ভাবস্থায় গ্যাস এবং পেট ফাঁপা

গর্ভাবস্থা আপনার দেহে দুর্দান্ত পরিবর্তনগুলির একটি পর্যায় এবং আপনার নিজের যথাসম্ভব যত্ন নেওয়া দরকার। যথাযথ যত্ন ব্যতীত, আপনি বেশ কয়েকটি সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন যা কেবল আপনারই নয় আপনার সন্তানেরও ক্ষতি করে। এ জাতীয় একটি সমস্যা হল গ্যাস এবং পেট ফাঁপা। যদিও এটি অনেক লোকজনের পক্ষে একেবারেই স্বাভাবিক, তবে গর্ভাবস্থায় গ্যাসের সমস্যার কারণে হওয়া অস্বস্তি এড়াতে আপনার স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

aniview

গর্ভাবস্থায় গ্যাস এবং পেট ফাঁপা কি স্বাভাবিক?

দিনে ১২ বার অবধি গ্যাস পাস করা স্বাভাবিক, তবে গর্ভাবস্থায় আপনি আরও বেশিবার এমনটি করতে পারেন। পেট ফাঁপা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আপনার প্যান্ট আলগা রাখা ভাল ধারণা। এটি আপনার পেট বাড়তে শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে হতে পারে।

আপনার বাচ্চা বড় হওয়ার সাথে সাথে পেটের গহ্বরের বেশিরভাগ অংশ দখল করে আপনার পেট এবং অন্যান্য অঙ্গগুলির বিরুদ্ধে চাপ দেয়। এটি আপনার হজম ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয় এবং গর্ভাবস্থায় গ্যাসের সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

গর্ভাবস্থায় গ্যাসের সমস্যা অনুভব করা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কারণটা এখানে রয়েছেঃ

কারণসমূহ

গর্ভাবস্থায় গ্যাসের সমস্যার একটি সাধারণ কারণ হল আপনার দেহের শারীরিক এবং হরমোনগত পরিবর্তন। আপনার রক্তে প্রজেস্টেরনের উচ্চতর স্তরগুলি আপনার পুরো শরীরের পেশীগুলিকে শিথিল করে তোলে, এতে আপনার হজম ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি আপনার হজম ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়, গ্যাস, পেট ফাঁপা, শ্বাসকষ্ট, ফোলা ভাব, আপনার পেটে অস্বস্তি ইত্যাদির কারণ হয়, বিশেষত ভারী খাবার খাবার পরে। হজম কমে যাওয়ার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং অম্বল জাতীয় সমস্যাও দেখা দেয়, এমনকি যদি আপনি আগে কখনও তাদের মুখোমুখি না হন।

গর্ভাবস্থায় গ্যাস এবং পেত ফাঁপার কারণগুলি

গ্যাস আপনার মুখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং ঢেঁকুর তোলার মাধ্যমে নির্গত হয়। হজমের ফলস্বরূপ আপনার পেটেও গ্যাস উৎপাদন করে। ব্যাকটিরিয়া খাবারগুলি ভেঙে ফেললে এটি ঘটে।

কিছু খাবার যা গ্যাস এবং পেট ফাঁপার কারণ হয়:

  • গোটা শস্য, মটরশুটি এবং কয়েকটি শাকসবজি যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রোকলি, ব্রাসেল স্প্রাউট এবং অ্যাস্পারাগাস।
  • ফ্রুক্টোজ: কিছু খাবার যেমন পেঁয়াজ, মধু, টিনজাতীয় টমেটো, মটরশুঁটি, কেচাপ ইত্যাদি খাবারের মধ্যে ফ্রুক্টোজ নামক একধরণের চিনি থাকে যা গ্যাস এবং পেট ফাঁপার কারণ হয়।
  • স্টার্চ: কিছু স্টার্চ যেমন ভুট্টা, গম এবং আলু গ্যাস সৃষ্টি করে। ভাত অবশ্য তা দেয় না।
  • ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার: ফাইবার সমৃদ্ধ কিছু খাবার যেমন শিম, মটরশুঁটি, ওটস দানা ইত্যাদি গ্যাসের কারণ হয়।
  • দুগ্ধজাত পণ্য: বিশ্বের একটি বড় অংশ ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতায় ভোগে। এটি এশিয়াতে বেশ সাধারণ। যখনই কোনও ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু ব্যক্তি দুগ্ধজাত খাবার খায়, তখন তারা পেট ফাঁপা অনুভব করে বা গ্যাসের অভিযোগ করে। এটি ঘটে কারণ তাদের দেহ ল্যাকটেজ প্রক্রিয়া করতে অক্ষম হয় যা দুগ্ধজাত পণ্য হজমে সহায়তা করে।
  • ভাজা এবং উচ্চ ফ্যাটযুক্ত খাবারগুলিও গ্যাসের কারণ হিসাবে পরিচিত।

গর্ভাবস্থায় গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি করে এমন আরও কিছু কারণ হল:

  • কোষ্ঠকাঠিন্য: যখনই অন্ত্রের গতি কমে যায় আপনার গোটে গ্যাস তৈরি হয়, তখন আপনি মলত্যাগ করতে সক্ষম হন না।
  • খাবারের সংবেদনশীলতা: আপনার পেট কিছু ধরণের খাবারের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারে, এটি কী খাবার তা সন্ধান করুন এবং এগুলি খাওয়া এড়াতে হবে।
  • কোলনে ব্যাকটেরিয়াল ভারসাম্যহীনতা: আপনার পেটে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যার ভারসাম্যহীনতা আপনার পেটে গ্যাস সৃষ্টি করতে পারে এবং পেট ফাঁপা ও অন্যান্য গ্যাসের সমস্যার কারণ হতে পারে। এর আরও ভাল তথ্য পেতে এবং নিরাময়ে সহায়তা করতে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

লক্ষণ

গ্যাসের বেশিরভাগ লক্ষণ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এর মধ্যে কয়েকটি হল:

  • স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় গ্যাস পাসিং
  • মুখে টক জল ওঠা
  • পেটে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে ব্যথা যা স্থান পরিবর্তন করতে থাকে, তবে দ্রুত মুক্তিও দেয়
  • আপনার পেটে একটি গিঁট লাগার মতো অনুভূতি
  • পেটের ফোলাভাব এবং টানটান ভাব

কখনও কখনও গ্যাস থেকে ব্যথা এত গুরুতর এবং অনবরত হতে পারে যে আপনি একটি বড় সমস্যার সন্দেহও করতে পারেন।

গর্ভবতী অবস্থায় গ্যাস এবং পেট ফাঁপা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রতিকার

আপনার বাচ্চা বড় হওয়ার সাথে সাথে আপনার জরায়ু প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে গ্যাস আরও বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। তবে গর্ভাবস্থায় গ্যাস্ট্রিক সমস্যার বেশ কয়েকটি ঘরোয়া প্রতিকার রয়েছে যা আপনাকে এ থেকে স্বস্তি পেতে সহায়তা করে। এই পদ্ধতিগুলি আপনার অনাগত সন্তানের কোন ক্ষতিও করে না। স্বস্তি পেতে নিয়মিত এই প্রতিকারগুলি অনুসরণ করুন।

১. প্রচুর পরিমাণে জল পান করুন

একদিনে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ গ্লাস জল পান করা হল লক্ষ্য। আপনি জলের পাশাপাশি অন্যান্য তরলগুলিও অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন, তবে আপনার সিস্টেমে একদিনে পর্যাপ্ত তরল ঢুকছে তা নিশ্চিত করুন।

প্রচুর পরিমাণে জল পান করুন

আপনি যদি ইরিটেবল বাউয়েল সিনড্রোমে (আইবিএস) ভুগছেন, তাবে নিশ্চিত করুন যে এগুলিতে কম পরিমাণে FODMAP (প্রাকৃতিক শর্ট-চেইন কার্বোহাইড্রেট এবং চিনির অ্যালকোহল যেমন গ্লুকোজ বা ফ্রুকটোজ) রয়েছে। আপনি ক্র্যানবেরি, আনারস, আঙুর বা কমলালেবুর রস চেষ্টা করতে পারেন। কারণ এগুলিতে FODMAP-এর নিম্ন স্তর থাকে।

২. শারীরিক কার্যকলাপ

ব্যায়াম অনুশীলন এবং শারীরিক কার্যকলাপ আপনার প্রতিদিনের রুটিনের একটি অংশ হওয়া উচিত। প্রতিদিন কমপক্ষে আধা ঘন্টা হাঁটার চেষ্টা করুন।

শারীরিক কার্যকলাপ

এটি আপনার হজমের গতি বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করতে পারে, আরও গ্যাস ও ফোলাভাবের লক্ষণগুলি হ্রাস করে। কোনও অনুশীলন শুরু করার আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে ভুলবেন না।

৩. আপনার ডায়েট পরীক্ষা করুন

কোনটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে তা জানতে খাবারের পরিবর্তন করার চেষ্টা করুন। কোন খাবারটি আপনার পেট ফাঁপার লক্ষণগুলির কারণ হয়েছে তা মনে রাখতে আপনি একটি ডায়েরিও লিখে রাখতে পারেন। খাদ্য (শাকসবজি) যা গ্যাস সৃষ্টি করে, তাতে বাঁধাকপি, আলু, স্প্রাউট এবং আরও অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত।

আপনার ডায়েট পরীক্ষা করুন

আপনি যদি আইবিএসে ভুগছেন তবে কোনও ডায়েট শুরু করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। স্বল্প FODMAP ডায়েট অত্যন্ত নিয়ন্ত্রক এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ না করে আপনার বাচ্চাকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই আপনার ডাক্তারের পরামর্শে পরিপূরক যোগ করার বিষয়টি বিবেচনা করুন।

৪. প্রচুর পরিমাণে ফাইবার গ্রহণ করুন

কখনও কখনও এমন খাবারগুলি যা গ্যাসের লক্ষণগুলি বাড়িয়ে দেয় সেগুলির পরিবর্তন কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণগুলিকে নিরাময় করতে পারে। ফাইবার হল এর একটি উপাদান: এটি আপনার অন্ত্রের জলের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে এবং মলগুলিকে সহজেই পাস করার জন্য সহায়তা করে।

প্রচুর পরিমাণে ফাইবার গ্রহণ করুন

কোষ্ঠকাঠিন্য হ্রাস করতে এবং গ্যাসের সমস্যা হ্রাস করতে আপনার ডায়েটে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম ফাইবার অন্তর্ভুক্ত করুন। এটি গর্ভবতী হওয়ার সময় কীভাবে গুরুতর গ্যাসের ব্যথা উপশম করা যায় তার একটি উত্তর হতে পারে।

৫. আপনার পা উঁচু করুন

যদি আপনার পেট ফুলে যায় বলে মনে হয় তবে এমন একটি স্থানে বসুন যেখানে আপনি পা উঁচুতে রাখতে পারেন। এটি আপনার পেটে আপনার শিশুর চাপ কমিয়ে দেবে এবং আপনার পেটের খাবারকে আরও অবাধে হজম করতে দেবে।

আপনার পা উঁচু করুন

আপনার অন্ত্রে খাবার সঠিকভাবে হজম হতে দিতে গর্ভাবস্থায় আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করা এড়িয়ে চলুন।

৬. অল্প করে খাবার খান

ক্রমবর্ধমান বাচ্চা আপনার পেটের বেশিরভাগ জায়গা নেয়, আপনার অন্ত্রে হজমের স্থান হ্রাস করে এবং বড় খাবার খাওয়ার ফলে আপনার খাদ্য হজম করা অসুবিধা হতে পারে, ফলে আপনি ফোলাভাব অনুভব করতে পারেন।

অল্প করে খাবার খান

পরিবর্তে, দিনের বেলাতে এটি বেশ কয়েকটি ছোট খাবারে বিভক্ত করুন। এটি আপনাকে বদহজমের ক্ষেত্রেও সহায়তা করতে পারে।

৭. যোগ ব্যায়াম

কিছু যোগব্যায়াম অবস্থানগুলি আপনাকে গ্যাস থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করতে পারে। গর্ভাবস্থায় আপনাকে গ্যাস এবং পেট ফাঁপা থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করার জন্য এগুলি ব্যবহার করে দেখুন।

যোগ ব্যায়াম

তবে, নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনি যোগব্যায়াম করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ এবং প্রাক-প্রসব যোগ প্রশিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করুন।

৮. স্ট্রেস এড়ানো

কখনও কখনও স্ট্রেস আপনার পেটে একটি ফুলে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। কারণ, যখনই আপনি উত্তেজনাপূর্ণ হন, আপনি প্রচুর বায়ু গ্রহণের প্রবণতা রাখেন যা গর্ভবতী হওয়ার সময় অনেকটা সমস্যার হয়ে যায়।

স্ট্রেস

এ ছাড়া আপনার সন্তানের উপরও স্ট্রেসের অন্যান্য প্রভাব থাকতে পারে। যথাসম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখুন এবং নিজেকে ও আপনার শিশুকে সুখী রাখুন।

৯. আরামদায়ক জামাকাপড় পরা

আপনার অন্ত্রের খাবারটি সঠিকভাবে হজম হওয়ার জন্য গর্ভাবস্থায় আঁটসাঁট পোশাক এড়িয়ে চলুন।

আরামদায়ক জামাকাপড় পরা

প্রসূতি জিন্স আপনার ক্রমবর্ধমান শিশুর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সরবরাহ করে, তবুও তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রতিবন্ধক হতে পারে আপনার পেট খাদ্য হজমের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান সীমাবদ্ধ করতে পারে।

১০. মেথি বীজ

এটি গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে পাশাপাশি পরবর্তী পর্যায়ে গ্যাস এবং ফোলাভাবের একটি দুর্দান্ত প্রতিকার।

মেথি বীজ

মাত্র এক চামচ মেথি বীজ ৬-৭ ঘন্টা বা রাত্রে জলে ভিজিয়ে রাখুন। বীজ বের করে দিয়ে সেই জল পান করুন।

গর্ভাবস্থায় গ্যাস এবং পেট ফাঁপা কি চিন্তার লক্ষণ?

বেশিরভাগ সময় গ্যাস একটি অনুপযুক্ত গর্ভাবস্থা ডায়েটের বা প্রজেস্টেরনের উচ্চ স্তরের ফলাফলের একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়া। তবে যদি আপনি অবিচ্ছিন্নভাবে এই অনুভূতি বোধ করেন এবং গর্ভাবস্থায় পেট ফাঁপা বা শ্বাসকষ্টের শিকার হন, তবে এটি কিছু খারাপ হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। আপনি যদি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন বা ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে প্রচণ্ড ব্যথা পান তবে এটি এমনকি মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। আপনি আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ এবং পেশাদার চিকিৎসা পাওয়া নিশ্চিত করুন।

অনেক হবু মা এই প্রশ্নটি নিয়ে তাদের ডাক্তারের কাছে যান ‘গ্যাস বা পেট ফাঁপার অনুভূত কি গর্ভাবস্থার লক্ষণ?’ মনে রাখতে হবে যে গ্যাস থাকার অর্থ এই নয় যে আপনি গর্ভবতী। একটি গর্ভাবস্থা পরীক্ষাই গর্ভাবস্থা যাচাই করার সেরা উপায়। গর্ভাবস্থায় গ্যাস এবং পেট ফাঁপা অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকে, তবে এগুলি সন্তানের পক্ষে কোনও হুমকি সৃষ্টি করে না এবং কয়েকটি ডায়েট ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনগুলির সাথে সহজেই চিকিৎসা করা যায়।