গর্ভাবস্থায় পেট ব্যথা

গর্ভাবস্থায় পেট ব্যথা

গর্ভাবস্থায় গুরুতর পেট ব্যথা গর্ভাবস্থা সম্পর্কিত জটিলতাগুলির একটি ইঙ্গিত হতে পারে এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসাসংক্রান্ত হস্তক্ষেপের যোগ্য।

aniview

এই নিবন্ধটি গর্ভবতী মহিলাদের গুরুতর পেট ব্যথার লক্ষণ এবং কারণগুলি, গর্ভবতী মহিলাদের গুরুতর মেডিকেল অবস্থা সহ প্রস্তাবিত চিকিত্সা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে।

পেট ব্যথা কী?

বেশিরভাগ হবু মায়েরা তাদের গর্ভাবস্থার কোনো কোনো সময়ে তাদের পেটে স্বাভাবিক যন্ত্রণা, ব্যাথা এবং খিঁচুনি অনুভব করেন। পেটে ব্যথা স্বাভাবিক, কারণ একটি বাড়ন্ত শিশু বহন করলে আপনার পেশী এবং জয়েন্টগুলির উপর চরম চাপ পড়তে পারে, তাই আপনার পেট নির্দিষ্ট সময়ে অস্বস্তি বোধ করতে পারে।

আপনি বিশ্রাম নিয়ে (যা খিঁচুনি থেকে মুক্তি দিতে পারে), উষ্ণ জলে স্নান করে, বা বেদনাদায়ক এলাকায় গরম জলের বোতল বা ব্যাগ রেখে পেট ব্যথা কমাতে পারেন।

তবে, যদি আপনার পেটে ব্যথা চলতেই থাকে বা আরও গুরুতর হয়, তবে এটি আরও গুরুতর গর্ভাবস্থা সম্পর্কিত জটিলতা বা সমস্যার একটি ইঙ্গিত হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় পেট ব্যথা

একজন গর্ভবতী মা হিসাবে, আপনার গর্ভাবস্থার ৩টি ত্রৈমাসিকে আপনি বিভিন্ন ধরনের পেটে ব্যথা অনুভব করতে পারেন। এই বিভাগে প্রতিটি ত্রৈমাসিকের সময় সাধারণ পেট ব্যাথাগুলি সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

১. প্রথম ত্রৈমাসিকে পেট ব্যথা

আপনার প্রথম ত্রৈমাসিকের সময়, আপনি আপনার পেটে খিঁচুনির ব্যাথা অনুভব করতে পারেন, যা আপনার শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের কারণে ঘটে। খিঁচুনি বলতে আপনার পেটের দুই দিকে একটি টান লাগার অনুভূতিকে বোঝায়। আপনার জরায়ুর বিস্তারের সময় সাপোর্টে থাকা লিগামেন্ট এবং পেশী প্রসারিত হওয়ার কারণে খিঁচুনি হয়। গর্ভাবস্থার কারণে খিঁচুনি স্বাভাবিক বলে মনে করা হয় এবং গ্যাস ও পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বা যৌন সঙ্গম সহ অন্যান্য কারণগুলির জন্যেও ঘটতে পারে।

গর্ভধারণের জন্য আইভিএফ চিকিত্সা গ্রহণকারী মহিলাদের ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিন্ড্রোম (ওএইচএস) নামক অসুস্থতা তৈরি হতে পারে, যার থেকে পেট ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা প্রধানত বাচ্চা হওয়ার ওষুধ প্রয়োগের ফলে ডিম্বাশয়ের অতিরিক্ত উদ্দীপনা সৃষ্টির কারণে হয়। এই ব্যথা সাধারণত গর্ভাবস্থার কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থায়ী হয় এবং এটি তার পরেও চলতে থাকলে ফার্টিলিটি ক্লিনিকে রিপোর্ট করতে হবে।

২. দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে পেট ব্যথা

গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে পেট ব্যথার একটি সাধারণ রূপ হল গোলাকার লিগামেন্টের ব্যথা, যা ২টি বৃহৎ লিগামেন্টের জন্য হয় যেগুলি জরায়ুকে কুঁচকির সাথে সংযুক্ত করে। গোল লিগামেন্টের পেশীটি জরায়ুকে সাপোর্ট দেয় এবং এটি যখন প্রসারিত হয়, তখন আপনি একটি তীব্র কাটার মতো ব্যথা অনুভব করতে পারেন, অথবা তলপেটে একটি হালকা ব্যাথা অনুভব করতে পারেন। কিছু মহিলা নিতম্ব বা কুঁচকি এলাকায় এই ধরনের ব্যথা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

গর্ভাবস্থায় গোল লিগামেন্টের ব্যথা স্বাভাবিক বলে মনে করা হয় এবং এটি কোনও গুরুতর জটিলতার দিকে পরিচালিত করে না।

৩. তৃতীয় ত্রৈমাসকে পেট ব্যথা

তৃতীয় ত্রৈমাসিকে, গর্ভবতী মহিলাদের পেটে, পিঠে এবং নিতম্ব সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা অনুভূত হয়। সন্তানের জন্মের প্রস্তুতিতে, আপনার শরীরের সংযোজক কলাগুলি আলগা হয়ে যায় এবং এইভাবে আপনার জন্ম দেওয়ার নালীর নমনীয়তা বাড়ায়। বেশিরভাগ গর্ভবতী মহিলাদের সংযোগকারী কলাগুলি আলগা ও প্রসারিত হওয়ার কারণে নিতম্ব বা পিঠের নীচের দিকে ব্যথা হয়।

তৃতীয় ত্রৈমাসিকে পেট ব্যথা একাধিক কারণে ঘটে যার মধ্যে রয়েছে:

গ্যাস এবং কোষ্ঠকাঠিন্য

গর্ভবতী মহিলাদের গ্যাস প্রাথমিকভাবে প্রজেস্টেরোন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে হয়। এই হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধির সাথে, পরিপাক নালীপথ ধীরগতি প্রাপ্ত হয়, যা খাদ্য প্রবাহ ধীর করে দেয়। বেশী করে জল খাওয়া, ব্যায়াম করা এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য নিয়মিত খাওয়ার মাধ্যমে গ্যাস এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করা যেতে পারে। অন্যান্য প্রতিকারের হিসাবে পায়খানা নরমকারী ওষুধ বা কৃত্রিম ফাইবার সম্পূরক ব্যবহার করা যেতে পারে।

ব্র্যাক্সটনহিকস সংকোচন

ব্র্যাক্সটন হিকস সংকোচন সংকোচনের একটি মিথ্যা রূপ, সাধারণত এর ফলে আপনার পেটের পেশী আঁটসাঁট হয়। ব্র্যাক্সটন হিকস সংকোচন প্রকৃত সংকোচনের থেকে অনেক ভিন্ন, যা আরও ঘন ঘন ঘটে, আরো দীর্ঘ সময় ধরে চলে এবং খুব বেদনাদায়ক হতে পারে। ব্র্যাক্সটন হিকস জলবিয়োজনের (ডিহাইড্রেশন) কারণে আরও বেশী করে ঘটে থাকে, তাই প্রচুর পরিমাণে জল পান করা এবং নিয়মিত বিশ্রাম এই অবস্থাকে নির্মূল করতে সাহায্য করতে পারে।

গর্ভাবস্থার পেট ব্যথার লক্ষণ

আপনি যদি আপনার গর্ভাবস্থার কোনো পর্যায়ে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলির কোনোটির সম্মুখীন হন, তবে এটি আরও গুরুতর জটিলতার ইঙ্গিত দিতে পারে, এ ক্ষেত্রে আপনাকে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হবে:

  • আপনি যখন প্রস্রাব করেন তখন রক্তপাত বা জ্বলে যাওয়ার অনুভূতি।
  • আপনার গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে পেট ব্যাথা
  • আপনার গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে যোনির থেকে দাগ লাগা বা রক্তপাত
  • একঘন্টায়৪টিরবেশিসংকোচন
  • গুরুতর বা অসহনীয় পেট ব্যাথা
  • প্রচন্ড মাথাব্যথা
  • নিয়মিত বমি বা জ্বর
  • আপনার মুখ, পা, বা হাত অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া
  • কোনো অস্বাভাবিক যোনি স্রাব

কিছু ক্ষেত্রে, এই লক্ষণগুলি আপনার গর্ভাবস্থার সাথে সম্পর্কিত নাও হতে পারে এবং এটি অন্য কোনও মেডিকেল অবস্থা যেমন ডিম্বাশয়ের সিস্ট, কিডনির অস্বাভাবিকতা, মূত্রনালীর সংক্রমণ, বা গল ব্লাডারের সমস্যার কারণে হতে পারে।

গর্ভবতী মহিলাদের পেট ব্যথার কারণ

সমস্ত মহিলারা গর্ভাবস্থায় পেটের অস্বস্তি অনুভব করেন, যা স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।

গর্ভবতী মহিলাদের পেট ব্যথা হওয়ার প্রাথমিক কারণ হল আপনার জরায়ুর ক্রমবর্ধমান আকার, যা আপনার শিশুর বাড়ার সাথে বড় হতে থাকে। জরায়ু প্রসারিত হওয়ার কারণে তলপেটের ব্যথা নিয়মিত হতে থাকে। আপনার জরায়ুর ওজন এবং আকারের বৃদ্ধি এটির সাপোর্টে থাকা লিগামেন্ট এবং পেশীগুলির উপর অসম্ভব চাপ সৃষ্টি করে, যা নিয়মিত খিঁচুনর কারণ।

গর্ভবতী অবস্থায় পেটের ব্যথা হওয়া কি স্বাভাবিক?

প্রাথমিক গর্ভাবস্থায় গর্ভবতী মহিলাদের তলপেটের বাঁ দিকে হালকা ব্যথা থাকা স্বাভাবিক। তবে, আপনার পেট সংলগ্ন এলাকায় কোন গুরুতর বা তীব্র ব্যথা খুব উদ্বেগের ব্যাপার।

খিঁচুনি সহ তলপেটের ব্যথা, যাকে গোল লিগামেন্টের ব্যাথা বলা হয়, গর্ভাবস্থার পুরো সময়কাল ধরে হলেও তাকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। পেট ব্যথা আপনার গর্ভাবস্থার পুরো ৯ মাস ধরে ভ্রূণ বহন করার জন্য আপনার জরায়ুর প্রস্তুত হওয়াকে ইঙ্গিত করে।

গর্ভাবস্থায় পেট ব্যথার সাথে যুক্ত গুরুতর চিন্তার বিষয়গুলি

এই বিভাগে কিছু গুরুতর জটিলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে যা গর্ভাবস্থায় গুরুতর পেট ব্যথা হওয়ার কারণে তৈরি হতে পারে।

১. এক্টোপিক গর্ভাবস্থা

একটি এক্টোপিক গর্ভাবস্থা তৈরি হয় যখন ডিম্বাণুটি জরায়ু ব্যতীত অন্য কোথাও রোপিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডিম্বাণুটি ফ্যালোপিয়ান টিউবে রোপিত থাকে। চিকিৎসা রেকর্ড অনুযায়ী, প্রতি ৫০টি গর্ভাবস্থায় একটি এক্টোপিক গর্ভাবস্থা ঘটে। এই অবস্থায় মহিলাদের, সাধারণত তাদের গর্ভাবস্থার ৬ষ্ঠ এবং ১০ম সপ্তাহের মধ্যে পেটের ব্যথা এবং রক্তপাত হয়। বেশিরভাগ এক্টোপিক গর্ভাবস্থা শুধুমাত্র গর্ভাবস্থার ৪র্থ এবং ৮ম সপ্তাহের মধ্যে নির্ণয় করা হয়।

এক্টোপিক গর্ভাবস্থা প্রাথমিক গর্ভাবস্থার সময়, নিয়মিত গর্ভাবস্থার থেকে আলাদা করে চেনা অত্যন্ত কঠিন। এক্টোপিক গর্ভাবস্থার ইঙ্গিত দিতে পারে এমন কয়েকটি লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • তলপেটে ব্যথার অনুভূতি, তার পর পেটের একপাশে তীব্র ব্যথা, যা পরে পুরো পেটে ছড়িয়ে পড়ে।
  • ব্যথা, যা গর্ভবতী মহিলাদের প্রতিটি নড়াচড়াতে বাড়ে।
  • হালকা রক্তপাত
  • যোনি থেকে রক্তপাত বা দাগ লাগা
  • অসুস্থতা, মাথা ঘোরা, বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
  • প্রস্রাবের সময় ব্যথা হওয়া সহ প্রস্রাব বৃদ্ধি পাওয়া।

যে মহিলারা এক্টোপিক গর্ভধারণের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের মধ্যে রয়েছেন সেইসব মহিলারা যাদের এগুলি আগে হয়েছে:

  • অতীতে এক্টোপিক গর্ভাবস্থা
  • এন্ডোমেট্রিওসিস
  • টিউবাল লিটিগেশন
  • গর্ভধারণের সময় ইন্ট্রাইউটেরিন ডিভাইস (আইইউডি)

এক্টোপিক গর্ভাবস্থাতে অবিলম্বে চিকিত্সার প্রয়োজন এবং পূর্ণ মেয়াদ চালিয়ে যেতে অনুমতি দেওয়া যাবে না। আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করে ডিম্বাণুটি জরায়ুতে রোপিত হয়েছে কিনা তা আপনার স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা ডাক্তার সহজেই নিশ্চিত করতে পারেন।

২. গর্ভস্রাব

প্রথম ত্রৈমাসিকের সময় গুরুতর পেট ব্যাথা ভোগকারী মহিলাদের জন্য এটি একটি বড় জটিলতা। গর্ভস্রাব, বা স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভপাত সাধারণত গর্ভাবস্থার প্রথম ১৩ সপ্তাহের মধ্যে ঘটে এবং সমস্ত গর্ভধারণের প্রায় ১৫-২০% এর দ্বারা প্রভাবিত হয়।

সম্ভাব্য গর্ভস্রাবের প্রধান লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • পিঠে চরম ব্যথা
  • প্রতি ৫-২০ মিনিটে সংকোচন ঘটা
  • খিঁচুনি সহ বাঁ ছাড়া গুরুতর রক্তপাত
  • রক্তপাত বা যোনি থেকে দাগ লাগার পর হালকা বা তীব্র খিঁচুনি
  • যোনি থেকে কলাকোষ বা ডেলার মতো পদার্থ বেরোনো
  • গর্ভাবস্থার অন্যান্য লক্ষণ হঠাৎ কমে যাওয়া

৩. অকাল প্রসব

যে সব গর্ভবতী মহিলারা, যারা তাদের গর্ভধারণের ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে নিয়মিত সংকোচন ভোগ করছেন, তার সাথে পিঠের ব্যাথা থাকে, তাদের অকাল প্রসব হতে পারে। অকাল প্রসব গর্ভাবস্থার ২৪তম থেকে ৩৭তম সপ্তাহের মধ্যে হতে পারে। এই সপ্তাহগুলির মধ্যে, সংকোচনের কারণে আপনি পেলভিক এলাকায় বা তলপেটে ব্যথা অনুভব করতে পারেন। সংকোচনের পরে যোনি তরল বা রক্ত লিক করে বেরিয়েও যায়।

অভিজ্ঞ ডাক্তার বা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা গর্ভবতী মহিলাদের এই সপ্তাহগুলিতে সংকোচন ভোগ করার পর অবিলম্বে মেডিকেল পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।

৪. প্ল্যাসেন্টার ছেদন

এটি শিশুদের জন্য একটি জীবন-সংশয়কারী অবস্থা, যেটি গর্ভাবস্থার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জরায়ু থেকে প্ল্যাসেন্টা (যা শিশুর জন্য অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহ করে) বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটে। প্ল্যাসেন্টার ছেদন প্রতি ২০০টি জন্মে একটি ঘটে এবং সাধারণত তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ঘটে। গর্ভবতী মহিলাদের, যাদের আগে গর্ভাবস্থায় প্ল্যাসেন্টার ছেদনের ইতিহাস রয়েছে, এবং যাদের উচ্চ রক্তচাপ, প্রীক্ল্যাম্পসিয়া এবং পেটে আঘাত ইত্যাদির মতো অন্যান্য চিকিৎসা জটিলতা রয়েছে, তাদের এই জটিলতার জন্য বেশী ঝুঁকি রয়েছে।

প্ল্যাসেন্টার ছেদনের প্রধান লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • অবিরত এবং বর্ধিত পেট ব্যথা
  • একটি লম্বা সময়কাল ধরে জরায়ুর শক্ত হয়ে থাকা
  • রক্তাক্ত তরল বা অকালে জল ভেঙে যাওয়ার প্রবাহ
  • রক্তের ফোঁটা সহ তরল স্রাব
  • পেটের নমনীয়তা

বেশিরভাগ মহিলাদের প্লাসেন্টার ছেদনের পর অবিলম্বে প্রসব শ্রম শুরু হয়ে যায় এবং তাঁরা জরুরী সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন। হালকা ছেদনের ক্ষেত্রে, ডাক্তাররা গর্ভাবস্থা চালিয়ে যেতে অনুমতি দিতে পারেন, বা প্রণোদিত শ্রম বা যোনির মাধ্যমে ডেলিভারি করাতে পারেন।

৫. প্রীক্ল্যাম্পসিয়া

প্রীক্ল্যাম্পসিয়া একটি হাইপারটেনসিভ ব্যাধি যা আনুমানিক ৫-৮% গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে ঘটে। এটি গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ পরে ঘটে এবং প্রস্রাবে প্রোটিনের উপস্থিতির সাথে উচ্চ রক্তচাপ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। প্রীক্ল্যাম্পসিয়া শিশুর বৃদ্ধি হ্রাস করতে পারে, কারণ উচ্চ রক্তচাপ গর্ভাবস্থায় রক্তবাহী নালীর কুঁচকে যাওয়ার কারণ হতে পারে, ফলে জরায়ুতে অক্সিজেন এবং পুষ্টির প্রবাহকে হ্রাস করে। এছাড়াও প্রীক্ল্যাম্পসিয়া প্লাসেন্টার ছেদনের ঝুঁকি বাড়ায়।

মারাত্মক প্রীক্ল্যাম্পসিয়ার নিম্নলিখিত সাধারণ উপসর্গ আছে:

  • ডান দিকের পেটে গুরুতর ব্যথা
  • উপরের পেটে ব্যথা, সাধারণত ডান দিকে পাঁজরের নীচে
  • বমি বমি ভাব
  • মাথাব্যাথা
  • ফোলা
  • দৃষ্টির ব্যাঘাত

গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ পর, বেশিরভাগ ডাক্তার এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত গর্ভবতী মহিলাদের রক্তচাপ পরীক্ষা করেন, কোন অস্বাভাবিকতা সনাক্ত করার জন্য।

৬. মূত্রনালীর সংক্রমণ

চিকিৎসার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১০% গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভাবস্থার সময়কালে কোনও সময়ে মূত্রনালীর সংক্রমণ (ইউটিআই) হয়। ইউটিআই দ্রুত সনাক্তকরণ করা গেলে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে চিকিত্সা করা যেতে পারে, তবে এই সমস্যাটি উপেক্ষা করলে মহিলাদের কিডনিতে গুরুতর সংক্রমণ হতে পারে যা অকাল প্রসবের সম্ভাবনা বাড়ায়।

ইউটিআই-এর সাথে যুক্ত সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • তলপেটে ব্যথা
  • প্রস্রাব করার সময় অস্বস্তি বা জ্বলে যাওয়ার অনুভূতি
  • বার বার প্রস্রাব করার তাড়ন
  • ঘোলাটে এবং গন্ধযুক্ত প্রস্রাব
  • যৌনাঙ্গে চুলকানি
  • অবিরত জ্বর জ্বর ভাব, ঘাম, এবং শীত লাগা

পিঠের নীচের অংশে, পাঁজরের খাঁচার নীচে, বা পেলভিক হাড়ের উপরে ব্যাথা। এটি কিডনিতে ইউটিআই ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও হতে পারে।

বেশিরভাগ ডাক্তার এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়ে থাকেন যা ইউটিআই ঘটাতে পারে এমন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পরীক্ষা করে। প্রাথমিকভাবে সনাক্ত হলে, ইউটিআইটি সহজে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে চিকিত্সা করা যেতে পারে।

৭. অ্যাপেনডিসাইটিস

গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অ্যাপেনডিসাইটিস রোগ নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে, যার ফলে বিলম্ব এবং মহিলাদের জন্য উচ্চ ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। এটি হওয়ার প্রাথমিক কারণ হল জরায়ু বেড়ে ওঠার সাথে, অ্যাপেনডিক্সটি উপর টেনে উঠে আসে এবং নাভি বা লিভারের কাছাকাছি অবস্থিত থাকে।

গর্ভবতী মহিলাদের অ্যাপেনডিসাইটিস হওয়ার সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • পেটের উপরের ডান পাশে ব্যথা
  • ক্ষুধার অভাব
  • বমি বমি ভাব
  • বমি করা

৮. গলস্টোন

গল স্টোন হল গর্ভবতী মহিলাদের পিত্ত থলিতে পাথরের উপস্থিতি। গল স্টোন পেটের উপরের ডান দিকের অংশে কেন্দ্রীভূত থাকে। কিছু ক্ষেত্রে, ব্যথা পিঠের চারিদিকে এবং ডান কাঁধের নীচে অনুভূত হতে পারে।

সেইসব গর্ভবতী নারীদের মধ্যে গলস্টোন সাধারণ ঘটনা, যাদের:

  • ওজন বেশী
  • বয়স ৩৫ বছরের বেশী
  • পাথর হওয়ার মেডিকেল ইতিহাস আছে

গর্ভাবস্থায় পেট ব্যথার অন্যান্য কারণসমূহ

উপরের অবস্থাগুলির পাশাপাশি, গর্ভাবস্থায় পেটের ব্যথা ঘটানোর অন্য কয়েকটি কারণ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • পেটের ভাইরাস এবং খাদ্যে বিষক্রিয়া
  • খাদ্যের প্রতি সংবেদনশীলতা
  • জরায়ুর বৃদ্ধি
  • কিডনিতে পাথর
  • হেপাটাইটিস

পিত্তথলির রোগ এবং প্যানক্রিয়াটাইটিস, উভয়ই সাধারণত গলস্টোনের উপস্থিতির ফলে ঘটে।

ফাইব্রয়েডগুলি, যেগুলি গর্ভধারণের সময় বৃদ্ধি পায় এবং অস্বস্তি সৃষ্টি করে।

পায়খানায় বাধা, যা সাধারণত তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ঘটে। এটি অন্ত্রের কলাগুলিতে ক্রমবর্ধমান জরায়ু দ্বারা বর্ধিত চাপের কারণে ঘটে।

প্রারম্ভিক গর্ভাবস্থায় পেটের খিঁচুনি

বেশিরভাগ গর্ভবতী মহিলারা তাদের প্রাথমিক গর্ভাবস্থার দিনগুলিতে পেটের খিঁচুনি অনুভব করেন। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো, পেটে হালকা খিঁচুনি হওয়া স্বাভাবিক এবং কোনো উদ্বেগের কারণ নয়। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকের দিনগুলিতে পেটের খিঁচুনির সাধারণ কারণগুলি নীচে দেওয়া হয়েছে:

যৌনমিলনের সময় একটি প্রচণ্ড উত্তেজনার পর, মহিলাদের খিঁচুনি অনুভূত হতে পারে।

গর্ভের দেওয়ালে ভ্রূণ রোপিত হলে অল্প রক্তপাতের সাথে খিঁচুনি হয়। শিশুকে জায়গা দেওয়ার জন্য ভ্রুণ আকার পরিবর্তন করলেও, খিঁচুনি ঘটতে পারে।

১২ সপ্তাহ পর, গর্ভবতী মহিলাদের কুঁচকির উভয় পাশে তীব্র ব্যথা অনুভব হতে পারে, বিশেষত যখন তারা দাঁড়িয়ে থাকেন, তাদের দেহকে প্রসারিত করেন, বা বাঁকান। এটির প্রাথমিক কারণ হল গর্ভকে সাপোর্ট দেওয়া লিগামেন্টের প্রসারিত হওয়া।

প্রাথমিকভাবে গর্ভধারণের সময় ঘটতে থাকা বেশিরভাগ পেটের খিঁচুনিগুলিকে বেশি বুকজ্বালা বা পিরিয়ডের ব্যথার মতো লাগে। প্রাথমিক গর্ভধারণের সময় পেটের খিঁচুনি হলে, আপনার স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা ধাত্রীকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

গর্ভাবস্থায় পেট ব্যথার জন্য প্রতিকারসমূহ

যদি আপনি কোনও গুরুতর জটিলতা নির্দেশ করে এমন কোনো উপসর্গের সম্মুখীন হন, তবে অবিলম্বে আপনার ডাক্তার বা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা ভাল। তবে, গর্ভবতী মহিলারা যদি পেটের মধ্যে হালকা ব্যথা অনুভব করেন, তাহলে বাড়িতে নিম্নলিখিত কোনো একটি প্রতিকারমূলক চিকিত্সার চেষ্টা করতে পারেন:

  • কিছু সময় বিশ্রাম নিলে বা শুয়ে থাকলে তাত্ক্ষণিক ব্যথার উপশম হতে পারে, বিশেষ করে ব্র্যাক্সটন হিকস সংকোচন দ্বারা সৃষ্ট ব্যাথাগুলি।
  • উষ্ণ (এবং গরম নয়) জলে স্নান করলে তলপেটে ব্যথা এবং খিঁচুনি থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করতে পারে।
  • গরম জলের বোতল (কাপড়ের মধ্যে আবৃত) বা ব্যাগ ব্যাথার জায়গায় প্রয়োগ করলে, ব্যথার অনুভূতি হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে।
  • উপরন্তু, আপনি পেট ব্যাথার ঘটনা কমাতে নিম্নলিখিত প্রতিকারগুলি চেষ্টা করতে পারেন:
  • বিশেষত প্রথম ত্রৈমাসিকে প্রসারণ এবং যোগব্যায়ামের মতো কোমল ব্যায়াম, বিশেষ করে গ্যাস সমস্যার জন্য, সহায়ক হতে পারে। আপনি আপনার ধাত্রী বা অন্য কোনো বিশেষজ্ঞের সাথে আপনার জন্য উপযুক্ত হবে এমন গর্ভকালীন ব্যায়ামের বিষয়ে কথা বলতে পারেন।
  • কোমর তীক্ষ্ণভাবে বাঁকাতে হবে যেখানে সেরকম নড়াচড়া এড়িয়ে চলুন।
  • সারা দিনে প্রচুর পরিমাণে জল খান। ব্র্যাক্সটন হিকস সংকোচনের প্রাথমিক কারণগুলির মধ্যে ডিহাইড্রেশন অন্যতম।
  • অল্প করে বারে বারে খাবার খান। ফল এবং সবজির মতো ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য চয়ন করুন।
  • প্রস্রাব করুন এবং আপনার মূত্রাশয় নিয়মিত খালি করুন।

হঠাৎ করে ওঠাবসা না করে, ধীরে ধীরে দাঁড়ানো বা বসার অভ্যাস তৈরি করুন। এটি আপনার খিঁচুনি কমাতে সাহায্য করবে।

যদিও পেটের খিঁচুনিগুলির জন্য গুরুতর উদ্বেগের কিছু নেই, তবে যদি আপনি অস্বস্তি বোধ করেন বা সেগুলি খুব গুরুতর হয়, তবে একজন ডাক্তারকে দেখানো ভালো।