গর্ভাবস্থায় উঠে দাঁড়ানো এবং বসার সেরা অবস্থানগুলি

গর্ভাবস্থায় উঠে দাঁড়ানো এবং বসার সেরা অবস্থানগুলি

গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে প্রায়শই তাদের পিঠ, ঘাড় এবং কাঁধে ব্যথা করার ব্যাপারে অভিযোগ করতে শোনা যায়।এই সকল যন্ত্রণাগুলি সাধারণত তাদের অনুভূত হয়ে থাকে গর্ভাবস্থায় তাদের অঙ্গভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ার কারণে।আপনি যদি গর্ভবতী হয়ে থাকেন, তবে উঠে দাঁড়ানো এবং বসার মত অতি সহজ কাজগুলিও আপনার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে এই সময় আপনার ওজন বেড়ে যাওয়ার কারণে।তবে এই জনবিশ্বাসের বিপরীতে, গর্ভাবস্থায় উঠে দাঁড়ানো এবং বসার একটা ভাল অবস্থান বা ভঙ্গিমা বজায় রাখাটা কঠিন কিছু নয়।

aniview

গর্ভাবস্থায় ভাল ভঙ্গিমা বজায় রাখার গুরুত্ব

বসার সময়, উঠে দাঁড়িয়ে থাকা বা শুয়ে থাকার সময় যখন আপনার দেহটি সঠিকভাবে সঠিক অবস্থায় থাকে তখন সেটিকে ভাল ভঙ্গিমা বলা হয়।সহজ কথায় বলতে গেলে এটি হল সোজা হয়ে দাঁড়ানো ও বসে থাকার একটি সু এবং সঠিক অভ্যাস।একটি ভাল অঙ্গবিন্যাস সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়।তবে গর্ভাবস্থায় এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।একটি ভুল অঙ্গভঙ্গি কেবল ব্যথা এবং অস্বস্তিই গড়ে তোলে না, তার পাশাপাশি এটি আবার গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে বা আঘাত লাগার কারণ হয়ে উঠতে পারে।গর্ভাবস্থার অন্তিম দশায়, হরমোনগুলি জয়েন্টগুলির লিগামেন্ট এবং টেন্ডনগুলিকে নরম করতে শুরু করার সাথে সাথে এই ব্যথা আরও গভীর হতে পারে।এই সময়ে, কোনও গর্ভবতী মহিলার প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজকর্মগুলিও সম্পাদন করার সময় নিজেদের মধ্যে অতিরিক্ত চাপ বা টান বোধ করার প্রবণতাটা বেশি থাকে। গর্ভাবস্থায় একটি ত্রুটিপূর্ণ বা খারাপ অঙ্গবিন্যাস বা ভঙ্গিমা নানা ধরণের জটিলতা এবং জয়েন্টগুলিতে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে এবং এমনকি প্রসবের পরেও।এটি আবার হজম এবং শ্বাস প্রশ্বাসের মত শারীরিক ক্রিয়াগুলিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।অতএব, আপনার পিঠ, কাঁধ, ঘাড় এবং নিতম্বের টান বা চাপ লাগাকে হ্রাস করার জন্য সম্পূর্ণ গর্ভাবস্থাকাল জুড়ে একটি ভাল ভঙ্গিমা বজায় রাখা অপরিহার্য।আর একটি ভাল ভঙ্গিমা গর্ভস্থ শিশুকে তার সঠিক জন্ম অবস্থানে থাকতে সহায়তা করবে।

বসার সঠিক ভঙ্গিমাগুলি

গর্ভাবস্থায় অস্বস্তি লাঘব এবং পিঠের মেরুদণ্ডের ওপর চাপ হ্রাস করার জন্য বসার সঠিক ভঙ্গিমাগুলি অবলম্বন করাটা জরুরি।এই সকল সহজ টিপসগুলি গর্ভাবস্থায় কীভাবে আপনার বসা উচিত তার উপায় আপনাকে দেখাতে পারেঃ

  • বসার সময়, আপনার পিঠটি সোজা হওয়া উচিত এবং আপনার কাঁধটি পিছনে টেনে নিচে নামাতে হবে।আর নিতম্বগুলি চেয়ারের পিছনে স্পর্শ হওয়া প্রয়োজন।
  • আপনার পায়ের পাতা মেঝের উপর সমানভাবে রাখুন। হাঁটু এবং নিতম্ব 90 ডিগ্রী কোণে সেট করা উচিত। শ্রোণীটিকে সামনের দিকে সামাণ্য ঝুঁকিয়ে সামঞ্জস্য করা উচিত।কানগুলি কাঁধের সাথে সরাসরি সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন, যা আবার নিতম্বগুলির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া দরকার
  • বসার জন্য শক্ত, পিঠের দিকটা সোজাভাবে সমর্থনযোগ্য এমন একটা চেয়ার বেছে নিন।অতিরিক্ত সহায়তার জন্য আপনার কোমরের পিছন দিকটায় রাখতে পারেন একটা নরম বালিশ অথবা ছোট একটা তোয়ালেকে রোল করে।
  • পায়ের পাতাগুলি একটু উঁচু করে রাখার জন্য একটা ফুটস্টুল বা পা তুলে রাখার ছোট একটা টুল রাখুন।এটি কোমর এবং পিঠের উপর পড়া অতিরিক্ত চাপ কমায়।আর আপনার যদি এভাবে পা তুলে রাখার মত কোনও ছোট টুল না থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি বসার জন্য এমন একটি চেয়ার বাছুন যেটি আপনার পক্ষে যথেষ্ট নীচু আর যার উপর বসলে আপনার পায়ের পাতাগুলি সমানভাবে মেঝের ওপর স্পর্শ করবে।
  • যদি একটানা অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনি কয়েকটা সহজ সরল পায়ের পাতার ব্যায়াম করতে পারেন আপনার পায়ে রক্ত সঞ্চালনা বাড়ানো এবং ক্র্যাম্প বা টান লাগা এড়ানোর জন্য।
  • বসা অবস্থা থেকে যখনই উঠে দাঁড়াবেন, চেয়ারের একদম প্রান্তের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসুন এবং আপনার পাগুলিকে সোজা করে নিজেকে তুলে ধরুন।এ সময় অবশ্যই যেকোনও গর্ভবতী মহিলাকে তার কোমরের সামনের দিকে নিচু হয়ে বা কোমর ভেঙ্গে উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছেকে দমন করতে হবে।
  • আপনার কাজের জায়গায় যদি আপনার দীর্ঘক্ষণ বসে থাকর প্রয়োজন হয়, তবে সেক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যবধানে মাঝে মধ্যেই উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের জন্য হেঁটে নিতে ভুলবেন না।
  • কর্মক্ষেত্রে আপনার ডেস্কে বসার সময়, আপনার বসার চেয়ারটিকে এমন এক উচ্চতায় সামঞ্জস্য করুন যাতে আপনার টেবিলের সমান থাকতে পারেন। আপনার ডেস্কটির কাছাকাছি বসুন যাতে আপনি টেবল কিম্বা চেয়ারের ওপর আপনার হাত, কনুইগুলি আরামদায়কভাবে রাখতে পারেন।এটা আপনার কাঁধগুলিকে আরাম দিতে সাহায্য করবে।
  • বসার আরেকটা ভাল অবস্থান হতে পারে, চেয়ারের ধার বরাবর বসে পুরোপুরি অবনমিত হওয়া, তারপর নিজেকে আস্তে আস্তে তুলে ধরুন এবং আপনার পিঠের বক্রতাকে যতটা সম্ভব উচ্চ করুন।এভাবে কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন।এবার অবস্থানটি সামাণ্য শিথীল করুন(মোটামুটি 10 ডিগ্রী মত)।আপনার উভয় নিতম্বের ওপর ওজনটাকে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া নিশ্চিত করুন।
  • গর্ভাবস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিকে বসার একটি অবস্থান হিসেবে একটা ব্যালেন্স বা ভারসাম্য বজায়কারী বল ব্যবহার করা উপকারী হতে পারে।তবে আপনার উচ্চতা অনুযায়ী যেটি সঠিক হবে সেরকম দেখেই একটা ক্রয় করা নিশ্চিত করুন।এটি লেবার বা শ্রমের জন্য আপনার শ্রোণীকে প্রস্তুত করতে সাহায্য করতে পারে এবং এমনকি সঠিক অবস্থানে গর্ভস্থ শিশুটিকে থাকাতেও সহায়তা করতে পারে।
  • মেঝের ওপর বসার সময়, আপনি মুচির মত উবু হয়ে বসতে পারেন।আপনার হাঁটুগুলিকে মুড়ে এবং গোড়ালিগুলিকে একসাথে সংযুক্ত করে সোজা হয়ে বসুন।

অন্তঃসত্ত্বাকালে এড়িয়ে চলার মত বসার ভঙ্গিমাগুলি

গর্ভাবস্থায় আপনার অঙ্গ বিন্যাসগুলির দিকে একটু বিশেষ মনোযোগ দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।এখানে বসার এমন কিছু অঙ্গ ভঙ্গিমার উল্লেখ করা হল যেগুলি গর্ভাবস্থায় এড়িয়ে চলা উচিতঃ

  • পায়ের উপর পা তুলে পাগুলিকে ক্রস করে বসা থেকে বিরত থাকুন।এটি আপনার মধ্যে খারাপ ভাবে রক্ত সঞ্চালন হওয়া, গোড়ালির গাঁট ফুলে যাওয়া অথবা ভেরিকোজ শিরাগুলি দেখা দেওয়ার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
  • যখন আপনার কোনওদিকে ঘোরার প্রয়োজন হবে, আপনার কোমরে মটকানো বা মোচর দেওয়া পরিহার করে চলুন।তার বদলে আপনার পুরো দেহটাকেই ঘুরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ আপনাকে দেওয়া হচ্ছে।তাছাড়া আবার সামনের দিকে নিচু হয়ে ঝোঁকা থেকেও নিরস্ত থাকুন।এটি তলপেটে অস্বাভাবিক চাপ ফেলতে পারে।
  • কোনও এক ভাবে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এড়িয়ে চলুন।কোনও একভাবে খুব অল্প সময়ের জন্যই বসুন(10-15 মিনিট)এবং নিয়মিতভাবে আপনার ভঙ্গিমাগুলি পরিবর্তন করতে এবং এবং তার সাথে নিজেকে সামঞ্জস্য করার কথা মাথায় রাখুন।
  • স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও জবুথবু হয়ে একভাবে বসা এড়িয়ে চলাই হল সবচেয়ে ভাল।
  • আপনার পাগুলিকে ঝুলিয়ে রেখে বসা এড়িয়ে চলুন।এটি আপনার পায়ে রক্ত সরবরাহ বৃদ্ধি করার সাথে সেগুলিকে ফুলিয়ে তুলতে পারে।
  • গর্ভাবস্থায় টুলে কিম্বা পিঠে হেলান দেওয়ার জায়গা ব্যতীত চেয়ারগুলিতে বসা এড়িয়ে চলুন।এটি আপনার পিঠে একটা অহেতুক চাপ তৈরী করতে পারে।

দাঁড়ানোর সঠিক ভঙ্গিমাগুলি

দাঁড়ানোর সঠিক ভঙ্গিমাগুলি বজার রাখা হল বসার সঠিক ভঙ্গিমাগুলির মতই গুরুত্বপূর্ণ।অন্তঃসত্ত্বাকালে উঠে দাঁড়াবার সময়েও যে বিষয়গুলি মনে রাখা উচিত সেগুলি নিম্নরূপঃ

  • আপনার মাথাটাকে সোজা করে ধরে রাখতে হবে, কাত করে নয়।
  • দাঁড়াবার সময় আপনার বুক সামনের দিকে এবং কাঁধের হাড়গুলিকে পিছনের দিকে টেনে রাখার পরামর্শ আপনাকে সর্বদা দেওয়া হচ্ছে।
  • আপনার কানের লতিগুলি থাকা উচিত আপনার কাঁধের মাঝ বরাবর স্থানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
  • হাঁটুগুলি সোজা রাখার মাধ্যমে সেগুলি দৃঢ় ভাবে আটকে বা লক করে রাখা এড়িয়ে চলুন।
  • শ্রোণীটিকে সামনে বা পিছনের দিকে কাত করে রাখা থেকে বিরত থাকুন।আপনার নিতম্বদ্বয়কে শক্ত করে রাখার এবং সমর্থ হলে পেটের মাংসপেশীগুলিকে টেনে রাখার পরামর্শ আপনাকে দেওয়া হয়।
  • আপনার পায়ের পাতার অবস্থান একইদিকে এবং ওজনটি দুটি পায়ের পাতার উপরেই সমান ভারসাম্যে রাখা উচিত।অল্প হিলের জুতোগুলি(ফ্ল্যাট বা একদম সমতল জুতো নয়) পায়ের খিলানগুলিকে সমর্থন করার জন্য পরা যেতে পারে।
  • একটানা দীর্ঘ সময় ধরে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পরামর্শ আপনাকে কখনই দেওয়া হয় না।

শোওয়া অবস্থা থেকে কীভাবে উঠে দাঁড়াবেন

আপনি যদি শোওয়া থেকে উঠে দাঁড়াতে চান, তবে বিছানায় একপাশে ঘুরে যান, হাঁটুগুলিকে কাছাকাছি টেনে আনুন এবং পাগুলিকে বিছানার পাশে ঘুরিয়ে দিন।এবার আপনার হাতগুলিতে ভর দিয়ে নিজেকে ঠেলে উঠে বসানোর চেষ্টা করুন।উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করার সময় ঝুঁকে নিচু হবেন না।

আপনার শারিরীক ব্যথা বেদনা, অস্বস্তিগুলিকে কমাবার জন্য সম্পূর্ণ গর্ভদশা জুড়ে উঠে দাঁড়ানো এবং বসার সঠিক ভঙ্গিমাগুলির খোঁজ করা এবং সেগুলি বজায় রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।এটি আপনার গর্ভাবস্থার যাত্রাপথটিকে কিছুটা সহজ এবং স্বস্তিদায়ক করে তুলবে।