গর্ভাবস্থায় মাখানা(পদ্মের বীজ) এর 9 টি স্বাস্থ্য উপকারিতা

গর্ভাবস্থায় মাখানা(পদ্মের বীজ) এর 9 টি স্বাস্থ্য উপকারিতা

যখন আপনি অন্তঃসত্ত্বা হন, আপনার অভ্যন্তরে আপনার গর্ভস্থ শিশুটির যথাযথভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করার জন্য বেশ কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য আপনার এড়িয়ে চলা উচিত।এই সময় কিছু খাবার যেমন আপনার স্বাস্থ্যের উপর তীব্র বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে আবার ঠিক তেমনই এমন কিছু খাদ্যও আছে যেগুলি উচ্চ মাত্রায় উপকারী, বিশেষ করে এই পর্যায়ের জন্য।এই ধরণেরই একটি খাদ্য হল মাখানা যা আবার ফক্স নাট বা পদ্মের বীজ নামেও অভিহিত।

aniview

মাখানা কি?

পদ্মের বীজ হিসেবে পরিচিত মাখানা এশিয়ায় ঔষধ প্রস্তুতের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।এছাড়াও আবার এটি এই মহাদেশের বিভিন্ন রন্ধনশালায় নানান রন্ধন প্রণালীগুলিতেও ব্যবহার করা হয়।

পদ্মের বীজ কাঁচা এবং রান্না করা এই দুই ভাবেই খাওয়া যেতে পারে এবং এর প্রচুর পুষ্টি মূল্য রয়েছে।গর্ভাবস্থায় মাখানা বা ফক্স নাট সেবন করার বেশ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতেগুলি সম্পর্কে পড়ে নিনঃ

মাখানার পুষ্টি গুণ

মাখানার পুষ্টি গুণ

মাখানা বীজগুলির মধ্যে রয়েছে এর প্রচুর পুষ্টি গুণ।গর্ভাবস্থায় মায়ের গ্রহণ করার জন্য বিবেচিত স্বাস্থ্যকর খাদ্যগুলির মধ্যে এটি অন্যতম এবং এটি পদ্ম ফুল থেকে নিষ্কাশন করা হয়।পদ্মের বীজগুলি মূলত দক্ষিণপূর্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার অধিবসীরা খেয়ে থাকেন।পদ্মের বীজে উপস্থিত কিছু পুষ্টি উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছেঃ

  • ক্যালসিয়াম
  • ফসফরাস
  • আয়রণ
  • ম্যাঙ্গানীজ
  • ভিটামিন B কমপ্লেক্স
  • পটাশিয়াম
  • অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং
  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি

গর্ভাবস্থায় ফুল মাখানা সেবনের সবচেয়ে ভালো দিকটি হল এই যে আপনি কীভাবে সেগুলিকে বানাতে চান তার উপর ভিত্তি করে সেগুলিকে নানা ভিন্ন উপায়ে সেবন করা যেতে পারে।সেগুলি দিয়ে স্যুপ, কারি অথবা ভাজা করে নিয়ে জলখাবার হিসেবে বেশ ভালই খাওয়া যেতে পারে।

গর্ভাবস্থায় মাখানা সেবন করার উপকারিতাগুলি

গর্ভাবস্থায় পদ্মের বীজ সেবন করার বেশ কিছু উপকারিতার কথা এখানে আলোচিত হলঃ

1.অনিদ্রা নিরাময় করে

অনিদ্রা নিরাময়ের জন্য মাখানার বীজগুলি দুর্দান্ত।হরমোন, মানসিক চাপ, এবং খাদ্যাভ্যাসের ধরণগুলির ক্রম পরিবর্তনের মত নানা কারণ হেতু অনিদ্রা দেখা দিতে পারে।আর মাখানা বীজ সেবন করলে তা অনিদ্রা নিরাময়ে ব্যাপকভাবে সহায়তা করতে পারে কারণ এর মধ্যে থাকে আইসোকুইনোলাইন অ্যালকালয়েড যার একটি প্রশমনকারী প্রভাব রয়েছে এবং ঘুমকে প্ররোচিত করতে পারেএর মধ্যে উপস্থিত ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি শারীরিক ক্রিয়াগুলিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করে যা একজন ব্যক্তিকে তার নিয়মিত ঘুমের সময় ঘুম ঘুম বোধ করতে এবং ঘুমিয়ে পড়তে সহায়তা করে

2.ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে

ডায়রিয়া হল অপর আরেকটি সমস্যা যেটি পদ্মের বীজের সহায়তায় সহজেই প্রতিরোধ করা যেতে পারে।হরমোনের ভারসাম্যের পরিবর্তনের কারণে প্রচুর মহিলা নানা ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হন, সেগুলির মধ্যে ডায়রিয়াও অন্তর্ভূক্ত আর পদ্মের বীজ এর জন্য একটি দুদার্ন্ত প্রতিকার হিসেবে কাজ করে একথা বলা হয়ে থাকে।পদ্মের বীজ আপনার পাচন ক্ষমতাকে আরও বৃদ্ধি করতে পারে এবং এই পর্যায়ে আপনার ভক্ষণ করা খাদ্যকে যথাযথভাবে হজম হওয়াকে নিশ্চিত করে।গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন কয়েকটি করে পদ্মের বীজ সেবন করলে তা ডায়রিয়া এবং হজম সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যাগুলিকে এড়িয়ে চলতে সহায়তা করে।

3.রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে

গর্ভাবস্থাকালে আপনার যদি রক্তচাপের মত সমস্যা থেকে থাকে, সেক্ষেত্রে আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য পদ্মের বীজগুলি একদম আদর্শ।পদ্মের বীজের ঠিক মাঝখানে একটি ভ্রূণ থাকে, যার মধ্যে রয়েছে ভিটামিনগুলি এবং এটি দেহে একটি শীতল প্রভাব সরবরাহ করে।ভ্রূণগুলি রক্ত প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে যখন আইসোকুইনোলাইননামক অপর তিক্তউপাদানটি শান্ত রাখে এবং শিরাগুলিকে প্রসারিত রাখতে সহায়তা করে।এর মধ্যে রয়েছে কম মাত্রায় সোডিয়াম, উচ্চ মাত্রায় পটাশিয়াম এবং উচ্চ পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম যা রক্তচাপ নিম্ন রাখে এবং রক্ত প্রবাহের উন্নতি ঘটায়।

4. যন্ত্রণাযুক্ত মাড়ি থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করে

গর্ভাবস্থায় আপনি যদি মাড়ি যন্ত্রণা বা মাড়ি থেকে রক্ত পরার সাথে যুদ্ধ করে চলেন, এটি হরমোনের ক্রম পরিবর্তনের কারণে হয় যেটি সাধারণত গর্ভাবস্থার মাঝ পর্যায়ে হয়ে থাকে।অতিরিক্ত জল ধরে রাখার কারণে মাড়িগুলিতে ক্ষত হয় যা যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠতে পারে।

পদ্মের বীজ সেবন করার দ্বারা আপনি দেহে ভিটামিন-B কমপ্লেক্সের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলতে পারেন।আর মাখানায় উপস্থিত জিঙ্ক আপনার মাড়ি পরিষ্কার করতে এবং যন্ত্রণা লাঘব করতে সহায়তা করবে।

5.ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে

গর্ভাবস্থায় যখন আপনার দেহে বেশ কিছু পাউণ্ড পুঞ্জীভূত করেন, আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণ করাটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।এই সময় আপনার ভালভাবে আহার করাটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু একই সময়ে আবার অতিরিক্ত খাওয়াটাও ঠিক নয়।পদ্মের বীজে গ্লাইসেমিক সূচক কম থাকায় এবং মাত্র কয়েকটি বীজ খাওয়ার পরেই আপনার পূর্ণতা বোধ করতে সহায়তা করার কারণে গর্ভাবস্থায় এগুলি চমৎকার।এগুলির পাশাপাশি মাখানার মধ্যে আবার প্রচুর অন্যান্য খনিজগুলিও উপস্থিত থাকে সুতরাং এগুলির সাথে আপনি আবার অন্যান্য প্রচুর পুষ্টিগুণগুলিও পেতে পারেন।

6. ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন

আপনি যখন গর্ভাবস্থায় পাউন্ডগুলিতে স্তূপ হবেন তখন আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণ করা শক্ত হতে পারে। এটি ভাল যে আপনি ভাল খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একই সময়ে, খুব বেশি খাওয়াবেন না। গর্ভাবস্থায় পদ্মের বীজ দুর্দান্ত কারণ তাদের গ্লাইসেমিক সূচক কম থাকে এবং এর মধ্যে কয়েকটি খাওয়ার পরে আপনাকে পূর্ণ বোধ করতে সহায়তা করবে। মাখনতে উপস্থিত অন্যান্য প্রচুর খনিজও রয়েছে, তাই আপনি প্রচুর পরিমাণে অন্যান্য পুষ্টির সম্পদও পেতে পারেন।

7.রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে

মাখানা আবার গর্ভাবস্থায় আপনার রক্ত শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়তা করতে পারেগর্ভাবস্থাকালে হরমোনের ক্রম পরিবর্তন এবং মানসিক চাপের কারণে আপনার রক্তের শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, আর পদ্মের বীজ তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করতে পারে।পদ্মের বীজগুলি ভিটামিন-B কমপ্লেক্স এবং ফাইবারে সমৃদ্ধ এবং কম ক্যালরি যুক্ত হয়ে থাকে।এগুলি আপনার দেহে অতিরিক্ত ক্যালোরি দহনে এবং আপনার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে।

8.এনার্জি বা শক্তি বৃদ্ধি করে

আপনি গর্ভবতী থাকাকালীন একটি অত্যন্ত বিরক্তিকর অনুভূতি হল ক্লান্তিএটি কাটিয়ে ওঠা খুব কঠিন হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে আপনি যদি কোনও কাজ শেষ করেন।আর এটির বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি দুর্দান্ত উপায় হল পদ্মের বীজ সেবন করা।এর মধ্যে রয়েছে আয়রণ, জিঙ্ক, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, প্রোটিন এবং ভিটামিনগুলি যা আপনাকে সারা দিন ধরে কর্মচঞ্চল এবং সক্রিয় বোধ করতে সহায়তা করে।

9.ভ্রূণের বিকাশ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে

পদ্মের বীজে উচ্চ মাত্রায় প্রোটিনের উপস্থিতির কারণে সেটি সেবনের দ্বারা আপনি সঠিক পদ্ধতিতে আপনার গর্ভস্থ ভ্রূণের বিকাশে সহায়তা করতে পারেন।প্রোটিনের পাশাপাশি এর মধ্যস্থ আরও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানগুলি ভ্রূণের কেন্দ্রীয় স্নায়ু তন্ত্রকে উন্নত করতে পারে এবং ভিটামিনগুলি শিশুকে আপনার গ্রহণ করা খাদ্য থেকে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানগুলি শোষণে সহায়তা করতে পারে।এছাড়াও পদ্মের বীজে প্রচুর পরিমাণে খনিজ এবং ভিটামিনগুলি উপস্থিত থাকায় সেগুলি সেবন করার দ্বারা আবার ভ্রূণের বৃদ্ধি এবং বিকাশে ব্যাপকভাবে সহায়তা করা যায়।

মাখানা কীভাবে খাওয়া যেতে পারে

অনেক মহিলাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, কীভাবে তাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার মধ্যে মাখানা অন্তর্ভূক্ত করবেন এই ভেবে।সত্যি বলতে আপনার পছন্দের উপর ভিত্তি করে এ ব্যাপারে অনেকগুলি উপায় আছে যেগুলি আপনি করতে পারেন।গর্ভাবস্থায় আপনি কীভাবে মাখানা বা পদ্মের বীজ খেতে পারেন তার কয়েকটি উপায় এখানে দেওয়া হলঃ

1.সাধারণ রোস্ট বা ভাজা

যখন আপনি সাধারণ ভাবে খান, তখন মাখানা পপকর্নের একটা দারুণ বিকল্প হয়ে থাকে।আপনাকে যা করতে হবে তা হল এক চামচ মাখন বা ঘিএর মধ্যে মাখানাগুলিকে হালকা করে ভেজে নিন।একটা সুন্দর স্বাদের জন্য আপনি আবার এর সাথে সামাণ্য লবণ, মরিচ গুঁড়ো এবং আপনার পছন্দসই অন্য কোনও মশলা যোগ করতে পারেন।

2.ক্ষীর

মাখনা, ক্ষীর বানানোর জন্য কেবল একটি পুষ্টিকর সংযোজনই নয়, যখন এটি যোগ করা হয় তা আবার ক্ষীরটিকে ঘন করতেও সাহায্য করে।উপরের বর্ণনানুযায়ী সাধারণ মাখানাগুলিকে খুব সহজভাবেই রোস্ট করে নিন, এবার সেগুলিকে গুঁড়ো করুন এবং রান্না শেষ করার পাঁচ মিনিট আগেই তা ক্ষীরের মধ্যে মিশিয়ে নিন।

3.লাড্ডু

সাধারণ মাখানাগুলিকে রোস্ট করে নিয়ে তাকে ব্লেন্ড করে মিহি পেস্ট বানিয়ে নিন। এবার এর সাথে এলাচ, কিশমিশ, কাজু, পেস্তা, আমন্ড ইত্যাদির মত লাড্ডু বানাবার অন্যান্য উপকরণগুলি যোগ করে মিশিয়ে নিন। এবং আপনার উপভোগ্য মনের মত পছন্দসই লাড্ডুটি গড়ে তুলুন।

আপনার মনের মধ্যে যদি এই প্রশ্নটি থাকে যে গর্ভাবস্থায় মাখানা খাওয়া কি ভাল?”; তবে এর উত্তর এখন আপনার কাছে নিশ্চই পরিষ্কারহ্যাঁ! দেহ এবং মনের জন্য পুষ্টির এক চমৎকার উৎস হল মাখানা।এর একাধিক স্বাস্থ্য উপকারিতা আছে আর এই একটি মূল কারণের জন্যই প্রাচীন এশিয়ার সংস্কৃতিতে এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।মাখানা সেবন করলে তা আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করবে, রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখবে এবং অন্যান্য আরও অনেক সহায়তা করে, সুতরাং পরের বার এটি খাওয়ার ইচ্ছে বোধ করলে আর দ্বিধা করবেন না যেন!