গর্ভাবস্থায় ঘাড়ে ব্যথা-কারণ,প্রতিকারসমূহ এবং প্রতিরোধ

Neck Pain after Sleeping - Causes and Tips to Ease

গর্ভাবস্থায়, আপনার দেহ হরমোনজনিত পরিবর্তনের এক উন্মত্ততার মধ্য দিয়ে যায়।হরমোনের অসামঞ্জস্যতা,বর্ধিত পেট,ঘুমের ভঙ্গিমার পরিবর্তন এবং অঙ্গ সঞ্চালনার অভাবের ফলে ঘাড়ে যন্ত্রণা হয়ে থাকে যা পিঠ এবং কাঁধেও ছড়িয়ে পড়ে।আপনার পরিবর্তিত দেহের আকৃতিটির জন্য পিঠ এবং মেরুদণ্ডের দিকে একটা চাপ সৃষ্টি করার প্রবণতা থেকে যায়,যার ফলস্বরূপ ঘাড়ে অস্বস্তিবোধ হয়।

aniview

একজন প্রত্যাশী মা প্রথম ত্রৈমাসিকে তার ঘাড়ে একটি স্টিফনেস বা কঠিনতা অনুভব করবেন এবং তার গর্ভাবস্থা বৃদ্ধির সাথে সাথে সেই যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকবেন। ঘাড়ে ব্যথা হল এক ধরণের বিরক্তিকর অস্বস্তি যা ঘাড়ে শুরু হয় এবং ক্রমশ কাঁধ ও পেশীগুলির কাছাকাছির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।এর ফলে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, মাথা ব্যথা, অসাড়তা এমনকি ঘাড়ে ফোলাভাব পর্যন্ত দেখা দেয়।বেশীরভাগ গর্ভবতী মহিলারাই ভেবে থাকেন যে,এই যন্ত্রণা মোকাবিলা করার কোনও উপায় নেই এবং সেটিকে নীরবেই সহ্য করে যান।বেশ,কিন্তু এক্ষেত্রে কিছু ভাল খবরও আছে।যেহেতু প্রত্যাশী গর্ভবতী মায়েদেরকে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ বা পেইনকিলারগুলি খাওয়ার সুপারিশ করা হয় না তাই এক্ষেত্রে ঘাড়ে যন্ত্রণা মোকাবিলা করার সেরা উপায় হল কিছু সহজ ঘরোয়া প্রতিকারের ব্যবহার।

গর্ভাবস্থায় ঘাড়ে ব্যথার কারণসমূহ

গর্ভাবস্থায় ঘাড়ে ব্যথার কিছু সাধারণ কারণ হলঃ

1. হরমোনগত পরিবর্তনঃ

গর্ভধারণের পর শরীরে হরমোনের পরিবর্তন এবং ভারসাম্যহীনতা ঘাড় ব্যথাকে পরিচালিত করে।হরমোনের অতিরিক্ত উত্থান পতন ও সঞ্চালনার কারণে ঘাড়ের পেশীগুলি শিথিল হয়ে ঝিমঝিম করতে থাকে এবং এই কারণে ঘাড়ের ঐ অঞ্চলে যন্ত্রণা হয়।

2. পেশীগুলির উপরে অতিরিক্ত চাপ পড়ার ফলেঃ

ঘাড়ের লিগামেন্টগুলি প্রসারিত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং আপনার পেটটি বর্ধিত ভ্রূণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বৃদ্ধি পেতে শুরু করার জন্য পিঠ এবং মেরুদণ্ডের পেশীগুলি আরও বেশী চাপ অনুভব করে।এর ফলে ঘারে যন্ত্রণা হয়।

3. ঘুমের ভঙ্গিমাঃ

যেহেতু গর্ভবতী মহিলাদের পরামর্শ দেওয়া হয় তাদের বা পাশ ফিরে শুতে,ফলে তাদের ঘুমের এই ভঙ্গিমায় দেহের বাদিকের অংশে একনাগাড়ে অনবরত চাপ পড়ার ফলেও তাদের ঘাড়ের অংশ শক্ত হয়ে ওঠে এবং যার ফলে যন্ত্রণা হয়।

4. অঙ্গ সঞ্চালনার অভাবঃ

গর্ভাবস্থার পরবর্তী পর্যায়ে,আপনার চারিপাশে ঘোরাঘুরি করার এবং অঙ্গ সঞ্চালনা করার অক্ষমতার কারণেও আপনার ঘাড়ে চাপ সৃষ্টি হয় এবং যন্ত্রণা করে।

আপনি গর্ভবতী হওয়ার সময় ঘাড় যন্ত্রণা থেকে উপশম পেতে ঘরোয়া প্রতিকারগুলি

প্রত্যাশী গর্ভবতী মায়েদের ব্যথা নিরাময়কারী বা অন্য কোনও ওষুধের বিষয়ে পরিষ্কারভাবে নিরস্ত থাকা উচিত যতক্ষণ না তাদের চিকিৎসক পরামর্শ দিয়ে থাকেন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের যা তাদের সেই ব্যথা বা অস্বস্তি হ্রাস করতে পারে।এর অর্থ এই নয় যে,গর্ভবতী মহিলাদের ঘাড়ে এই অত্যন্ত যন্ত্রণা ভোগের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।এক্ষেত্রে বিভিন্ন নিরাপদ ঘরোয়া প্রতিকার রয়েছে যা ঘাড় যন্ত্রণা লাঘব করতে পারে যদি সেগুলি সঠিকভাবে অনুশীলন করা হয়।নিম্নে কিছু সহজ চিকিৎসার উল্লেখ করা হল যেগুলি গর্ভাবস্থায় ঘাড়,কাঁধ,পিঠের উপরিভাগের যন্ত্রণার উপশমে সাহায্য করবে।

1. হিট/কোল্ড থেরাপি বা গরম/ঠাণ্ডা চিকিৎসা

প্রতিদিন ঘাড়ে বরফের প্যাক প্রয়োগ করা যন্ত্রণা উপশমের একটা দুর্দান্ত উপায়।ঠাণ্ডা এবং গরম এই উভয় ধরনের চিকিৎসাই প্রয়োজনীয় এবং এই ঠাণ্ডা-গরম কম্প্রেশনটি নিয়মিত বিরতিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

2. সঠিক বালিশ নিন

গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে ভুলভাল বালিশ অথবা তাদের মাথাকে অবলম্বন দিতে একাধিক বালিশ নিয়ে শোওয়ার প্রবণতা থাকে যার ফলে তাদের ঘাড় এবং পিঠে ব্যথা হয়।একটি আরামদায়ক বালিশের জন্য বিনিয়োগ করুন এবং মাতৃত্বসুলভ অবস্থায় একটি ভাল ঘুমের ভঙ্গি বজায় রাখতে আপনার হাঁটুগুলির তলায় বালিশগুলি দিয়ে সমর্থন করা বাঞ্ছনীয়।

3. এটি প্রসারিত করুন

প্রসারণ বা স্ট্রেচিং ঘাড় এবং পিঠে ব্যথায় অনেকটা স্বস্তি আনবে।গর্ভাবস্থায় প্রত্যাশী মায়েদের জন্য এই প্রসারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রে পরিবর্তন এবং ওজন বৃদ্ধির ফলে পেশীগুলিকে টান করে এবং প্রসারিত হওয়া ব্যথাকে সহজ করে দেয়।

4. হাইড্রোথেরাপি

ঘাড়ে ব্যথার উপশমের জন্য অন্য আরেকটি প্রমাণিত প্রতিকার হল হাইড্রোথেরাপি। যখন আপনি সাওয়ারের বা ঝর্নার তলায় দাঁড়াবেন লক্ষ্য রাখুন জলের ধারাটিকে প্রভাবিত এলাকার উপরে ফেলতে।ঘাড়ের উপর সেই জলের ধারাটিকে 3-4 মিনিট ধরে বজায় রাখুন।আরও 60 সেকেন্ডের জন্য ঠাণ্ডা জলের ধারায় সেটি পরিবর্তন করুন। স্বস্তি পেতে কয়েকবার এটির পুনরাবৃত্তি করুন। গরম জল রক্ত ​​সঞ্চালনকে উদ্দীপিত করে এবং শক্ত পেশীগুলিকে সহজ করে তোলে যখন ঠান্ডা জল বিদ্যমান যে কোনও প্রদাহকে হ্রাস করবে।

5. জলভিত্তিক হালকা অনুশীলন

কিছু জলের খেলাধূলা যেমন সাঁতারের সাথে নিজেকে সংযুক্ত রাখুন যেহেতু এটি ঘাড়ে ব্যথাকে সহজ করে তুলতে পরিচিত।আপনার এই ব্যথাকে প্রশমিত করতে আপনার ডাক্তারবাবু আপনাকে জল নির্ভর কিছু ধরণের অনুশীলনের পরামর্শ দিতে পারেন।

6. মালিশ

আপনার স্বামী বা পরিবারের কাউকে আপনাকে ঘাড়ে মালিশ করে দিতে বলুন,বিশেষ করে উষ্ণ ঝরনার পরে।উত্তাপটি আপনার পেশীগুলিকে শিথিল করতে সহায়তা করবে এবং গরম স্নানের পরে মালিশ করার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হবে।আপনি যদি পারেন তবে প্রসবপূর্ব ম্যাসেজের কোনও সুবিধাকে বেছে নিতে পারেন। ভাল ফলাফলের জন্য ল্যাভেন্ডার তেল, নারকেল তেল বা জলপাই তেল দিয়ে মালিশ করার চেষ্টা করুন।

7. টেনিস বল ব্যবহার করুন

আপনাকে যন্ত্রণা থেকে উপশম পেতে আপনি কোনও টেনিস বলকে ভালভাবে ব্যবহার করতে পারেন। আপনার পিঠ এবং দেওয়ালের মধ্যে নরম বলটিকে রাখুন এবং আস্তে আস্তে এক পাশ থেকে অন্য পাশে সরে সরে যান। পছন্দসই মাপে চাপ পেতে আপনার শরীরের ওজনকে ব্যবহার করুন।

8. অ্যাপেল সীডার ভিনিগার ব্যবহার করুন

 

ঘাড়ে ব্যথা উপশমের অন্য আরেকটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহবিরোধী উপাদান হল অ্যাপেল সীডার ভিনিগার।আপেল সীডার ভিনেগারের মধে কিছু তুলো বা একটি কাগজের তোয়ালে ভিজিয়ে রাখুন। এবার প্রভাবিত স্থানে সেটিকে দু-ঘন্টার জন্য রেখে দিন।ফলাফলের জন্য দুবার পুনরাবৃত্তি করুন।

ঘাড় ব্যথা প্রতিরোধের জন্য পরামর্শ

 

যেহেতু বলা হয় যে,প্রতিরোধ সর্বদা নিরাময়ের চেয়ে ভাল,তাই,গর্ভাবস্থায় ঘাড় যন্ত্রণা প্রতিরোধের বেশ কিছু উপায় এখানে দেওয়া হল।

  • একটি ভাল ভঙ্গিমা বজায় রাখুন। আপনি বাড়ার সাথে সাথে আপনার দেহের ভারসাম্য মেরুদণ্ডের দিকে ঝুঁকবে এবং কোনওরকম অস্বস্তি হ্রাস করার জন্য একটি সোজা এবং দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখা অপরিহার্য।
  • আপনার ঘাড়ে ব্যথা কমাতে সাহায্য করবে, সাঁতার অথবা জলের মধ্যে করা যেতে পারে এমন কিছু ধরনের অনুশীলনের জন্য আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
  • ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার পরে একজন কাইরোপ্র্যাক্টরের সাথে কথা বলুন। একজন কাইরোপ্র্যাক্টর প্রাকৃতিকভাবে আপনার দেহের জয়েন্টগুলির মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে এবং ব্যথা উপশম করার চেষ্টা করবেন।
  • কোনও কিছুর দিকে তাকানোর সময় সর্বদা চোখের স্তরের সঠিক মাত্রা বজায় রাখুন এবং অবনমিত না হওয়ার চেষ্টা করুন।স্ক্রীন বা পর্দার সামনে বসে কাজ করা মহিলাদের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্লুচিং বা নীচের দিকে তাকানো মানে আপনার ঘাড়টি কোনও সঠিক কোণে অবস্থিত নেই যা ব্যথা প্রতিরোধ করবে।
  • খুব শক্ত এবং আরামদায়ক নয় এমন বালিশ ব্যবহার করবেন না,সঠিক বালিশ ব্যবহার করুন।

গর্ভাবস্থায় ঘাড়ের ব্যথা কমাবার জন্য কয়েকটি সাধারণ ব্যায়াম

আপনার গর্ভাবস্থার সময় বিশেষত প্রথম ত্রৈমাসিকে আপনার ঘাড়ের যন্ত্রণা কয়েকটি সাধারণ ব্যায়াম এবং কাজের মাধ্যমে কমাতে পারেন। যেটা খুব সহজেই আপনি ঘরে করতে পারেন এই কাজগুলি আপনি প্রয়োগ করুন অবশ্যই তার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। যদি দীর্ঘক্ষন ধরে যন্ত্রণা হতে থাকে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন।

  • সোজা হয়ে মাটিতে বসুন এবং সামনের দিকে সোজা ভাবে তাকান । আপনার মাথা ঠিক এইবার বাম দিকে  ঘোরান যতটা দূর সম্ভব এইভাবে প্রায় 15 সেকেন্ড থাকুন। তারপর আস্তে আস্তে প্রথম অবস্থানে মাথাটাকে নিয়ে আসুন।
  • একইরকমভাবে মাথাটিকে ডান দিকে ঘোরানো এবং তারপর ধীরে ধীরে পুনরায় আগের অবস্থানে নিয়ে আসুন।
  • আপনার চিবুকটিকে এইবার বুকের দিকে চাপ দিন এবং 15 সেকেন্ড এইভাবে রাখুন। তারপর আবার আগের অবস্থানে নিয়ে আসুন।

গর্ভাবস্থাকালীন সময়ে ঘাড়ের যন্ত্রণা খুব একটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এই সময়ে  সমস্যাটিকে  এড়াবার জন্য  আপনি সাধারণত কোন রকম ওষুধ বা পেইনকিলার ব্যবহার করতে চাইবেন না। হবু মায়েদের এই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্যের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে না যেহেতু এই সমস্যাটিকে দূরীভূত করা যায় কতগুলি সহজ ঘরোয়া পদ্ধতি প্রয়োগ করে কারণ ওষুধ খাওয়া সব সময় সবচেয়ে ভালো বিকল্প কখনই হয়ে ওঠেনা।তবে কোনরকম  ঘরোয়া প্রক্রিয়া শুরু করার আগে সব সময় একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার বাবুর পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন যার দ্বারা যে কোনো রকম জটিলতা কে দূরে রাখা সম্ভব হবে।