আপনার সন্তানকে স্তন পান করানোঃ কীভাবে শুরু করা যেতে পারে

আপনার সন্তানকে স্তন পান করানো

স্তন পান করানো হল একটি অত্যন্ত জরুরী প্রাকৃতিক এবং সহজাত অভ্যাস তবে এটি আবার মা এবং সন্তান উভয়ের জন্যই একটি শিক্ষণীয় প্রক্রিয়া।স্তন পান করানো আপনার সন্তানকে অসুস্থতা থেকে সুরক্ষা প্রদানের পাশাপাশি আপনার এবং আপনার সন্তানের মধ্যে একটি বিশেষ বন্ধন গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং তা ছাড়াও আবার এটি শিশুর পর্যাপ্ত শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি সুনিশ্চিত করে।

aniview

স্তন পান করানো সর্বোত্তম কেন?

নবজাতকদের জন্য স্তন দুধ নিশ্চিত ভাবে একটি সর্বশ্রেষ্ট স্বাস্থ্যকর খাদ্য।আপনার সন্তানের খাওয়ার জন্য এটি হল সবচেয়ে সেরা এবং সুরক্ষিত খাদ্য।শিশুদের প্রথম 6 মাস বিশেষভাবে স্তন পান করানোর জন্য কেন সুপারিশ করা হয়ে থাকে তার কয়েকটি কারণ এখানে উল্লেখ করা হলঃ

  • বুকের দুধ পুষ্টিকর উপাদানে সমৃদ্ধ এবং এটি আপনার সন্তানের প্রয়োজনীয়তার জন্য একটি সুষম ডায়েট সরবরাহ করে।
  • এতে ডজন খানেক প্রয়োজনীয় ভিটামিন,খনিজ,একাধিক গুরুত্বপূর্ণ হরমোন এবং অনাক্রম্যতা বৃদ্ধিকারী উপাদানগুলি রয়েছে যার ঘাটতি সম্পূরক খাদ্য অথবা ফরমূলা দুধগুলির মধ্যে রয়েছে।
  • একটি নবজাতককে স্তন পান করানোর ক্ষেত্রে আবার শিশুর স্নায়বিক বিকাশেও কিছু উপকারী প্রভাব পড়ে।
  • আবার শিশুকে একভাবে স্তন পান করানোর ক্ষেত্রেও তা শিশুকে তার জীবনের প্রথম দিকে বিভিন্ন অসুস্থতা থেকে যেমন নিউমোনিয়ার মত শ্বাসপ্রশ্বাসের সংক্রমণ এবং অন্ত্রপ্রাদাহের মত গ্যাস্ট্রিক রোগ থেকে রক্ষা করে।
  • এছাড়াও স্তন পান করানো মায়ের পক্ষেও বেশ উপকারী হয়ে উঠতে পারে এবং মায়ের প্রসব পরবর্তী ওজন হ্রাসে সহায়তা করতে পারে।এই ক্রিয়াটি সম্পাদনের দ্বারা আবার ব্রেস্ট বা স্তন ক্যান্সার এবং সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের মত বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করতেও সহায়তা করতে পারে

স্তন পান করানো কখন শুরু করবেন?

স্তন পান করানো কখন শুরু করবেন?শিশুর জন্মের সাথে সাথেই আপনার স্তন পান করানো শুরু করা উচিত কারণ শিশুকে জন্মদান করার পরবর্তী প্রথম ঘন্টার মধ্যে আপনার যে দুধ বা কোলোস্ট্রাম(মায়ের বুকের প্রথম হলদেটে দুধ)উৎপন্ন হয় তা পুষ্টিকর উপাদানদগুলিতে সমৃদ্ধ হয়ে থাকে।স্বাভাবিকভাবে জীবনের প্রথম ঘন্টাগুলিতে শিশু ভালভাবেই স্তন চোষণে ইচ্ছুক হয় এবং তাই প্রথম দিকে খাওয়ানো একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।এটি মা এবং সন্তানের মধ্যে ভালোভাবে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে একটা সুসম্পর্ক বিকাশে সহায়তা করে।জন্মের পর যতটা সম্ভব আপনার সন্তানকে আপনার ত্বকের যোগাযোগের মধ্যে রাখার জন্য এটি একটি বেশ ভাল ধারণাশিশুদের স্তনের কাছাকাছি শোয়ালে স্বভাবতই তাদের মধ্যে চোষণ করা,স্তনের মধ্যে তাদের নাক ঘষতে থাকা এবং স্তনবৃন্তগুলি অনুসন্ধান করার মত ক্রিয়াকলাপগুলি প্রদর্শন করার প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যায়।প্রথমের দিকে শিশুকে যখন বেশ কয়েকবার স্তন পান করানো হয়ে যায় তখন সে স্বভাবগতভাবেই শিখে যায় আরও ঘন ঘন স্তন পান করতে।স্বাভাবিক সক্রিয় শিশুদের সন্ধ্যে এবং মধ্যরাত সহ প্রায় প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় খাওয়ানোর প্রয়োজন হবে।একবার আপনার বাচ্চার ক্ষুধা পরিতৃপ্ত হয়ে গেলে সে কম ঘ্যান ঘ্যান করবে এবং একভাবে ভাল করে ঘুমাবে।

স্তন পান করানোর জন্য প্রস্তুতি

স্তন পান করানো শুরু করার পূর্বে আপনার এবং আপনার সন্তানের উভয়ের জন্যই একটা স্বস্তিদায়ক বা আরামদায়ক অবস্থানে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।আর সেটি বেছে নেওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি অবস্থান রয়েছে এবং আপনার নার্স বা স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারী এক্ষেত্রে আপনার পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত হতে পারে এমন একটি অবস্থান বাছাই করতে আপনাকে অবশ্যই সহায়তা করবেন।একটি আরামদায়ক অবস্থান বলতে বোঝায় যেখানে আপনি কিছু সময়ের জন্য কোনওরকম অস্বস্তি ছাড়াই থাকতে পারেন এবং আপনি স্তন পান করানোর সময় শিশুর সাথে আবার চোখের যোগাযোগও করতে সক্ষম হন

এখানে শিশুদের স্তন পান করানোর অত্যন্ত সাধারণ কয়েকটি অবস্থানের উল্লেখ করা হলঃ

  • পিঠে ভর দিয়ে অর্ধশায়িত অবস্থায় স্তন পান করানোঃ এই কৌশলটিতে আপনাকে হেলান দিয়ে অথবা অর্ধশায়িত অবস্থায় থাকার সম্মতি দেওয়া হয় যাতে আপনার ছোট্ট শিশুটি আপনার ধড়ের উপরে সংলগ্ন হয়ে স্থির থাকতে পারে।
  • ক্র্যাডল হোল্ড: আপনি ক্র্যাডল হোল্ডকেও পছন্দ করতে পারেন, যার দ্বারা আপনি আপনার বাচ্চাকে আপনার বুকের সামনে ধরে রাখতে সমর্থ হন
  • পাশে শোওয়ার কৌশলঃ যে সকল মহিলাদের স্তনগুলি আকারে বড় হয়ে থাকে তাদের জন্য এই কৌশলটি উপযুক্ত।

স্তন পান করানোর সাথে সাথে বাচ্চার দিকে নজর রাখা এবং সে যে যথাসম্ভব অ্যারিওলার কলাটিকে চোষণ করছে তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে একটি নবজাতককে বুকের দুধ পান করানো শুরু করবেন

বাচ্চাকে কীভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো যায় সে সম্পর্কে একটি ভাল বোঝাপড়া কাজটিকে আরও সহজ করে তোলে।

বাচ্চাটিকে আপনার কাছাকাছি এমনভাবে ধরুন যাতে সে আপনার স্তনের মুখোমুখি থাকে।আপনার স্তনবৃন্তটিকে তার উপরের ঠোঁটে স্পর্শ করান এবং যেই মুহূর্তেই সে তার মুখটিকে খুলবে তৎক্ষণাৎ তাকে আপনার স্তনের উপর টেনে নিন।আপনার স্তনবৃন্তের চারপাশের গাঢ় অ্যারিওলার অঞ্চলটির বেশিরভাগ জায়গাটি জুড়েই যাতে শিশুটির মুখটি আবৃত থাকে সে ব্যাপারটি নিশ্চিত করুন।

কীভাবে একটি নবজাতককে বুকের দুধ পান করানো শুরু করবেন

একবার খাওয়ানো শুরু করলে সেটি মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক না হয়ে ওঠাকে নিশ্চিত করুন।খাওয়ানোর পরে হয়ে থাকা যেকোনও কোমলতার দিকে মনোযোগ দিন।যদি শিশুটি সঠিকভাবে চোষণ করে তবে সেক্ষেত্রে স্তনবৃন্তের চারপাশের গাঢ় অ্যারিওলার অঞ্চলটির বেশিরভাগ অংশটিই শিশুটির মুখের ভিতরে থাকবে এবং আপনার স্তনবৃন্তে চোষণ করার অনুভূতি অনুভূত হবে।

শিশু স্তনবৃন্ত চোষণ করার সময় যদি আপনার ব্যথা লাগে তবে শিশুটির মুখ এবং আপনার স্তন বৃন্তের মাঝে একটি আঙ্গুলের দ্বারা বাঁধার সৃষ্টি করে শিশুটিকে স্তনবৃন্ত থেকে অসংলগ্ন করার মাধ্যমে খাওয়ানোর প্রক্রিয়াটিতে একটা সাময়িক বিরতি আনুন।
আরামদায়ক এবং যথাযথভাবে অবস্থান করা হয়ে গেলে আপনি পুনরায় খাওয়ানো শুরু করতে পারেন।

স্তন পান করানোর জন্য আরামদায়ক অবস্থানগুলি

আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী যেটি আপনার সুবিধা হয় সেটি খুঁজে বের করার জন্য আপনি স্তন পান করনোর বিভিন্ন অবস্থানগুলি প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারেন।এখানে তারই কয়েকটি দেওয়া হল যেগুলি আপনি বিবেচনা করতে পারেনঃ

স্তন পান করানোর জন্য আরামদায়ক অবস্থানগুলি

1.দোলনার মত কোলে করে ধরে রাখার কৌশল

এটি স্তন পান করানোর খুব সাধারণ একটি অবস্থান যা ভালভাবে ঘাড়ের নিয়ন্ত্রণ করতে পারা শিশুদের পক্ষে আরামদায়ক।

  • আপনার কোলের মধ্যে পেটের সাথে একে অপরের বিরুদ্ধে আপনার শিশুটিকে স্থাপন করে আপনার কনুইয়ের দ্বারা তার মাথাটিকে সমর্থন করে রাখুন।
  • অবস্থানটি এমন হওয়া উচিত যাতে শিশুটির মুখটি আপনার স্তনের কাছাকাছি থাকে এবং তার বাহু আপনার বগলের সাথে মানানসই হয়ে থাকে।
  • আপনার অপর হাতের বুড়ো আঙ্গুলটিকে আপনার স্তনের অ্যারিওলার অঞ্চলের উপরে স্থাপন করার মাধ্যমে আপনার স্তনটিকে সমর্থন করুন।আপনার হাতের আঙ্গুলগুলি আপনার স্তনের তলদেশে অবস্থান করবে।
  • ধীরে ধীরে আপনার স্তনটিকে আপনার সন্তানের নিম্ন ওষ্ঠে স্পর্শ করান। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ শিশুটি তার মুখ খুলবে এবং নাক মুখ ঘষার মাধ্যমে সে আপনার স্তনবৃন্তটি ধরার চেষ্টা করবে।
  • আপনার শরীরের উপরে শিশুটিকে ধরুন এবং স্তন পান করার ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করুন।

স্তন পান করানোর বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে অর্ধশায়িত অবস্থায় বাচ্চাকে ধরে রেখে খাওয়ানোটি হল এমন একটি অবস্থান যেখানে মা তার শিশুর সাথে আড় হয়ে বা হেলান দিয়ে অর্ধ শায়িত অবস্থায় তার স্তনের দিকে মুখোমুখি করে তার ধড়ের উপরে শিশুটিকে ধরে রাখেন।কৌশলটি শিখতে এবং স্তনের উপর চোষণ করতে শিশুটি কিছুটা সময় নিতে পারে।

2. ক্র্যাডল ক্রস হোল্ডিং কৌশল

এটিকে ক্রসওভার হোল্ডও বলা হয়ে থাকে, যেখানে মা তার একটি হাত দিয়ে তার বাচ্চাটিকে ধরে থাকতে পারেন

  • আপনার বাহুর দ্বারা আপনার বাচ্চার ঘাড়ে সমর্থন করে তাকে ধরে রাখুন।
  • তার মুখটিকে আপনার স্তনের কাছে এমনভাবে আনুন যাতে সেই পথে বাহুটি না আসে।
  • আগের অবস্থানে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তার বিপরীতে আপনার হাতগুলি ব্যবহার করুন।
  • আপনার ফাঁকা হাতের সাহায্যে আপনার আঙ্গুলগুলিকে আপনার স্তনের কলার নীচে স্থাপন করার মাধ্যমে আপনার স্তনটিকে সমর্থন করুন,এক্ষেত্রে আপনার বুড়ো আঙ্গুলটি আপনার স্তনের অ্যারিওলার অঞ্চলের উপরে থাকবে।
  • ধীরে ধীরে আপনার স্তনটিকে আপনার সোনার নিম্ন ওষ্ঠে স্পর্শ করান।
  • প্রতিক্রিয়াস্বরূপ শিশুটি তার মুখ খুলবে এবং নাক মুখ ঘষার মাধ্যমে সে আপনার স্তনবৃন্তটি ধরার চেষ্টা করবে।
  • আপনার দেহের উপর আপনার শিশুটিকে ধরে তাকে স্তন পানে সহায়তা করুন।
  • আপনার শিশুর দিকে ঝুঁকে পড়ার পরিবর্তে তাকে আপনার দেহের দিকে টেনে আনুন।

3. ফুটবলের মত করে ধরে রাখার কৌশল

এই কৌশলটি প্রয়োগের চেষ্টা করার পরামর্শ দেওয়া হয় সেই সকল মায়েদের যারা সিজারিয়ান পদ্ধতির দ্বারা সন্তান প্রসব করেছেন অথবা যারা বৃহৎ স্তনের অধিকারিণী হয়ে থাকেন।এছাড়াও আবার এই প্রক্রিয়ায় অকাল প্রসবিত শিশুদেরও খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।

  • বাচ্চাকে এমনভাবে রাখুন যে আপনার হাতটি যেন তার ধড়ের উপরে পড়ে এবং আপনার হাতটির সাহায্যে তার ঘাড় ধরে রাখুন।
  • আপনার বাচ্চাকে স্তনের দিকে টেনে নিয়ে তাকে স্তন পান করতে দিন।এবার আপনার বাচ্চার মাথাটিকে এমনভাবে ধরুন যাতে তার নাক এবং থুতনিটি আপনার স্তনে স্পর্শ করে।
  • একবার স্তন চোষণ এবং খাওয়ানো হলে শিশুটির কাঁধগুলি যাতে শিথিল হয়ে যায় সেই ব্যাপারটিকে নিশ্চিত করুন।

4. যমজদের জন্য পরিবর্তিতরূপে ফুটবলের মত করে ধরে রাখার কৌশল

যমজ সন্তানের মায়েরা তাদের সন্তানদের হয় পৃথকভাবে অথবা একই সময়ে একইসাথে তাদের সন্তানদের খাওয়াতে পারেন।পরবর্তী ক্ষেত্রে,আপনার সন্তানদের প্রতিটি স্তন থেকে চোষণ করার জন্য আপনি এই অবস্থানটি চয়ন করতে পারেন।

  • কনুইগুলিকে আংশিকভাবে বাঁকিয়া প্রতিটি বাহুতে একএকজনকে ধরে রাখুন।
  • এবার আপনার হাতের তালুগুলির দ্বারা তাদের ঘাড়ে সমর্থন করুন।
  • এরপর তাদের স্তনের সহিত সংলগ্ন করে চোষণ শুরু করতে সহায়তা করুন।

5. পাশে শুয়ে খাওয়ানোর কৌশল

নবজাতকে খাওয়ানোর সময় এই অবস্থানটি মাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়।এটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা দক্ষতার প্রয়োজন আছে কিন্তু একবার শিখে গিয়ে অনুশীলন করা শুরু করলেই সাধারণত বেশিরভাগ মায়েদের কাছেই এটি বেশ পছন্দের একটি অবস্থান হয়ে দাঁড়ায়।এটি আবার সিজারিয়ান বা অস্ত্রপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করে থাকা মায়েদের জন্যও উপযুক্ত।

  • আপনার এবং শিশুর পেটগুলির মুখোমুখি বরাবর পাশাপাশি শুয়ে পড়ুন।।
  • পায়ের উপরিভাগকে বাঁকিয়ে নিলে তা আপনাকে একটি আরামদায়ক অবস্থান পেতে সহায়তা করবে।
  • আপনার আঙ্গুলগুলির সাহায্যে আপনার স্তনটিকে সঠিক অবস্থানে নিয়ে এসে আপনার বাচ্চাকে তা চোষণে এবং নিজে থেকে খেতে সহায়তা করুন।

একটি শিশুকে কতক্ষণ ধরে স্তন পান করাবেন?

বিভিন্ন অধ্যয়ন এবং আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাগুলি শিশুদের অন্তত প্রথম ছয় মাসের জন্য কোনওরকম জল, খাদ্য সম্পূরক, ফলের রস, দুধ অথবা খাবার সরবরাহ না করে টানা একভাবে বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়।আর স্তন পান করানোর ক্ষেত্রে এর বর্ধিত সময়কাল হিসেবে বারো মাস পর্যন্ত সময়সীমাকে নিরাপদ হিসেবে সুপারিশ করা হয়ে থাকে।

কীভাবে বুঝবেন যে আপনার সন্তান পর্যাপ্ত স্তন পান করেছে কিনা?

জন্মের পরেই প্রথম খাওয়ানোতে সাধারণত দুধের পরিবর্তে কোলোস্ট্রাম(মায়ের বুকের প্রহম হলদেটে দুধ)থাকে,যা হল অ্যান্টিবডি দ্বারা সমৃদ্ধ একটি হলদেটে জলীয় তরল বিশেষ যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।কয়েক দিনের মধ্যেই নিয়মিত খাওয়ানোর জন্য এটি দুধে পরিণত হয়ে যায়।একটি সাধারণ চিন্তা যেটি থেকে থাকে তা হল শিশুটি পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলো কিনা।আপনি যদি তাকে তার চাহিদা অনুযায়ী খাইয়ে থাকেন এবং সে যদি সময় মত তার প্রস্রাব ত্যাগ করে থাকে ও প্রতিদিন প্রায় 7-8 বার মল ত্যাগ করে এবং সেটি যদি হলুদ বর্ণের এবং আধা শক্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে,তবে নিশ্চিত হন যে ভালভাবেই তার খাওয়া সম্পাদিত হয়েছে।

তবে আপনার বাচ্চার মধ্যে যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা যায়,সেক্ষেত্রে আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা উচিতঃ

  • বাচ্চা যদি কেবল 10 মিনিট বা তার থেকেও কম সময়ের জন্য খায়।
  • আপনি যদি বাচ্চার খাওয়ার প্রতি অনিচ্ছা এবং বার বার উদাসীন হয়ে যেতে লক্ষ্য করেন।
  • তার ত্বকে হলদেটে আভা লক্ষ্য করেন।
  • গাঢ় অথবা পিচ্ছিলকারক বা থকথকে মল হয়ে থাকে।

আপনার শিশুকে কতবার স্তন পান করানো উচিত?

নবজাতককে স্তন পান করানোর কোনও নির্দিষ্ট সময় সংখ্যা নেই,তবে সাধারণত একটি স্বাস্থ্যকর বাচ্চাকে দিনে 8 অথবা তার বেশি বার খাওয়ানো হয়ে থাকে। আপনার বাচ্চার চাহিদা অনুযায়ী তাকে খাওয়ানোর অনুশীলন করানোই সবচেয়ে ভাল।অতিরিক্ত খাওয়ানো ক্ষতিকারক হতে পারে যা এড়ানো উচিত।

একটি ক্ষুধার্ত শিশু সাধারণত অস্থির হয়ে উঠবে,অতিরিক্ত মাত্রায় কাঁদবে এবং তার আঙ্গুল অথবা বুড়ো আঙ্গুল চুষতে থাকবে কিম্বা তার চোখনাকমুখ ঘষতে থাকবে।এই লক্ষণগুলি হল আসলে নবজাত শিশুকে স্তন পান করানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিপস যা কখন আপনার শিশুকে খাওয়ানোর প্রয়োজন আছে তা বুঝতে আপনাকে সহায়তা করতে পারে।

সিজারিয়ান পদ্ধতিতে সন্তানের জন্মদানের পর তাকে স্তন পান করানো

স্তনপান করনো একটি সিজারিয়ান পদ্ধতির দ্বারা সাধারণত প্রভাবিত হয় না।যদিও শল্যচিকিৎসার শারীরিক চাপ এবং এর জন্য পরিচালিত ওষুধগুলি আপনার সন্তানের স্তন পান করার ক্ষেত্রে কিছুটা বিঘ্ন ঘটাতে পারে,তবে সন্তানের জন্ম দেওয়ার কয়েক ঘন্টা অর্থাৎ মোটামুটি 6-12 ঘন্টা পর থেকেই আপনাকে বার বার যতটা সম্ভব ঘন ঘন স্তন পান করানোর জন্যই পরামর্শ দেওয়া হয়।আর একবার সেটি শুরু করে দিলেই দুধের সরবরাহ হওয়া নিশ্চিত করবে এবং স্তন পান করানোর ক্ষেত্রে আর কোনও সমস্যার সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়।এর জন্য আপনার সন্তানকে ঠিকঠাক অবস্থানে আনার জন্য আপনি আপনার সঙ্গীর সহায়তা নিতে পারেন।এবং আপনার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আপনি দোলনার মত করে ধরে রাখার কৌশল,পাশে খাওয়ানোর কৌশল অথবা ফুটবলের মত ধরে রাখার অবস্থানকে বেছে নিতে পারেন।

1. স্তন পান করানো মায়েদের কোন খাবারগুলি খাওয়া উচিত?

একজন .স্তন পান করানো মায়ের একটি সুষম ডায়েট ব্যতীত আর বিশেষ তেমন কিছুই প্রয়োজন হয় না যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হলঃ

স্তন পান করানো মায়েদের কোন খাবারগুলি খাওয়া উচিত?

  • শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য উপকরণ,রুটি,ভাত এবং আলু।
  • খাদ্যে ফাইবার বা তন্তু এবং অতিরিক্ত পুষ্টি যুক্ত করার জন্য গোটা গমের পণ্য পছন্দ করুন।
  • দুগ্ধজাত পণ্য যেমন দুধ এবং দই
  • প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন মাছ,মাংস এবং ডিম
  • তাজা ফল এবং পরিষ্কার সবজি
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে জল এবং তরল পান

যে কোনও পরিস্থিতিতেই একজন স্তন পান করানো মায়ের ধূমপান এবং মাদক দ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকা উচিত।

স্তন পান করানোর জন্য কি কিনবেন?

এর জন্য নার্সিং ব্রা কেনার পরামর্শ দেওয়া হয় যেহেতু এগুলি আপনার স্তনকে ভালভানে সমর্থন করে।বার বার খাওয়ানোর জন্য চেন এবং হুকের সাথে এই ব্রাগুলি প্রকৃতই আরামদায়ক।সম্পূর্ণ রূপে খোলা যায় এমন বেষ্টনীর সাথে মানানসই হয়ে বসে এমন ধরনের ব্রা ব্যবহার করাই আপনি নিশ্চিত করুন।যদি কোনও ক্ষেত্রে স্তন অপ্রতুলভাবে উদ্ভাসিত হয় বা প্যাডগুলি স্তনের উপর চাপ প্রয়োগ করে তবে এটি দুগ্ধ নালীকাগুলিকে অবরুদ্ধ করে দিতে পারে যার ফলে ম্যাসটাইটিস (স্তনের কলার প্রদাহ) সৃষ্টি হতে পারে।

স্তন পান করানোর জন্য কি কিনবেন?

অক্সিটোসিনের প্রতিক্রিয়ার কারণে আপনার স্তনগুলি থেকে দুধ লিক করতে পারে,নিজেকে শুষ্ক এবং আরামদায়ক রাখার জন্য ভ্রমণ করার সময় পুনরায় ব্যবহারযোগ্য এমন ব্রা এর প্যাড পরিধান করুন। পারে।রাত্রে পরিধানের জন্য হালকা ব্রাগুলিও আবার উপলভ্য।অতিরিক্ত দুধের প্রয়োজন হওয়ার ক্ষেত্রে স্তন পাম্প করা সহায়ক হতে পারে।

আপনার সন্তানকে স্তন পান করানোর সময় মুখোমুখি হতে পারেন এমন সমস্যাগুলি

নিম্নলিখিত পরিস্থিতিগুলির ক্ষেত্রে স্তন পান করানো জটিল হয়ে উঠতে পারে।

  • আপনার মধ্যে স্তনের সংক্রমণ(ম্যাসটাইটিস) বা দুগ্ধ নালীর সংক্রমণ হতে পারে।
  • শিশুর অযথাযথ ভাবে চোষণ প্রক্রিয়া।
  • পেট ঠেসে স্তন পান অথবা বেদনাদায়ক স্তনবৃন্ত বিশেষত প্রথম সপ্তাহগুলিতে। মনে রাখবেন বুকের দুধ খাওয়ানো ব্যথাহীন হওয়া উচিত।
  • শিশুটি কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ বয়সী হয়ে থাকতে পারে তবে দিনে 7-8 টি ডায়াপারের প্রয়োজন হয় না।
  • শিশুটি তন্দ্রাচ্ছন্ন অথবা অতিরিক্ত অলস প্রকৃতির হতে পারে,প্রতিদিন মাত্র আট বারেরও কম খাওয়াতে হতে পারে।
  • অকাল প্রসব,সাফল্য অর্জনে ব্যর্থতা, প্যাথলজিকাল জন্ডিসের মত চিকিৎসাগত শর্তগুলি এবং কাটা তালু বা ঠোঁটের মতো জন্মগত ত্রুটিগুলি বা নিউরোবিকাশজনিত সমস্যাগুলি থাকলে।
  • আপনার ডাক্তারের থেকে যথাযথ সমর্থন এবং সহযোগিতার দ্বারা এই সকল সমস্যাগুলির সমাধান করা যেতে পারে এবং আপনার সন্তানের সুস্বাস্থ্যের জন্য তাকে স্তন পান করানো চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি আপনাকে সহায়তা করতে পারে।

একজন নতুন মায়ের জন্য বুকের দুধ পান করানো হল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প।অনুশীলন,সচেতনতা এবং ধৈর্যের সাথে আপনার বাচ্চাকে খাওয়ানো একটি ঝামেলা মুক্ত উপায়ে সম্পন্ন করা যেতে পারে।একবার আপনি এটি প্রয়োগ করা শুরু করলে উপলব্ধি করতে পারবেন যে,বুকের দুধ হল এমন একটি শ্রেষ্ঠ জিনিস যা বাচ্চার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার কারণে একজন মা তার নবজাত শিশুটির মুখে এটিকে উপহারস্বরূপ তুলে দিতে পারেন।