গর্ভাবস্থায় নাশপাতি খাওয়া – এটি কি নিরাপদ?

গর্ভাবস্থায় নাশপাতি খাওয়া – এটি কি নিরাপদ?

গর্ভাবস্থা একটি সূক্ষ্ম সময়, এই সময়ে ভারসাম্যযুক্ত খাবার খাওয়া প্রয়োজনীয়। নাশপাতি হল সুস্বাদু গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল যা প্রায় হাজার বছর ধরে প্রচলিত রয়েছে। তাদের সুস্বাদু স্বাদ ছাড়াও এগুলি পুষ্টিতে সমৃদ্ধ। গর্ভাবস্থায় নাশপাতি কতটা উপকারী, সেগুলি খাওয়ার বিভিন্ন উপায় এবং আপনার গর্ভাবস্থায় এগুলি খাওয়ার সাথে সম্পর্কিত সতর্কতাগুলি বুঝতে এই নিবন্ধটি সহায়তা করবে।

aniview

গর্ভাবস্থায় নাশপাতি খাওয়া কি নিরাপদ?

গর্ভাবস্থায় নাশপাতি সম্পূর্ণ নিরাপদ। এগুলিতে ক্যালোরি কম থাকে এবং এতে গর্ভবতী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ পুষ্টিকর সামগ্রী রয়েছে। সেবন করার আগে সেগুলি ভালভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত, তবে এটি খোসাযুক্ত সমস্ত ফলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এটি এমন কোনও ক্ষতিকারক রোগজীবাণু থেকে মুক্ত করতে পারে যা ফলের পৃষ্ঠের উপরে থাকতে পারে। এই রোগজীবাণুগুলি টক্সোপ্লাজমোসিস এবং লিস্টারোসিসের মতো রোগের মাধ্যমে মারাত্মক গর্ভাবস্থার জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

গর্ভবতী মহিলা কতগুলি নাশপাতি খেতে পারেন?

গর্ভাবস্থায় নাশপাতির প্রস্তাবিত পরিমাণ হল প্রতিদিন প্রায় ১-৩টি মাঝারি আকারের।

গর্ভাবস্থায় নাশপাতি খাওয়ার স্বাস্থ্যকর উপকারিতা

নাশপাতি মিষ্টি ও টক স্বাদের ফল, যা বেশিরভাগ গ্রীষ্মের মাসে পাওয়া যায়। এগুলি প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিতে সমৃদ্ধ যা স্বাস্থ্যকর গর্ভাবস্থার বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় নাশপাতি খাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলি নিচে দেওয়া হল।

১. নাশপাতির মধ্যে থাকা ক্যালোরি

গর্ভবতী মহিলারা দুজনের জন্য পুষ্টির যোগান দিতে খাচ্ছেন এবং তাদের আগের চেয়ে বেশি শক্তিতে পূর্ণ খাবারের প্রয়োজন। ভ্রূণের বৃদ্ধি, গর্ভাবস্থার বিকাশ, দুধ উত্পাদন ইত্যাদি সহ শরীরের সমস্ত প্রক্রিয়াগুলির জন্য শক্তি অপরিহার্য। নাশপাতিতে ক্যালোরি কম থাকলেও এগুলি স্বাস্থ্যকর ফলের কার্বসের (শর্করা) উত্স।

২. নাশপাতিতে ভিটামিন সি

ভিটামিন সি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে এটি মানবদেহের বিভিন্ন কার্য পরিচালনা করে। এর মধ্যে কয়েকটি হল:

  • ভিটামিন সি কোষগুলিতে ফ্রি র‌্যাডিক্যালগুলির সাথে লড়াই করে, যা জারণে ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং বৃদ্ধি, বিকাশ ও শক্তি উত্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সেলুলার প্রতিক্রিয়াগুলিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
  • এটি ভ্রূণের নিউরোলজিকাল বিকাশের পাশাপাশি ছোট বাচ্চাদের জ্ঞানীয় দক্ষতাতেও উত্সাহ দেয়।
  • এটি গর্ভবতী মহিলাদের পাশাপাশি ভ্রূণের মাড়ি ও দাঁতকেও শক্তিশালী করে।
  • এটি খাদ্য, বিশেষত আয়রন থেকে পুষ্টির শোষণে সহায়তা করে। আয়রন শিশুর বিকাশে বিশেষত রক্ত ​​গঠন এবং সংবহনতন্ত্রের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

নাশপাতিতে ভিটামিন সি

৩. নাশপাতিতে পটাসিয়াম থাকে

নাশপাতিতে পটাসিয়াম কম পরিমাণে থাকে, তবে এটি সেলুলার এবং টিস্যু স্তরে শরীরের বেশ কয়েকটি কার্যক্রমে দায়বদ্ধ। তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হল:

  • পটাসিয়াম গর্ভবতী এবং গর্ভস্থ শিশু, উভয়ের ক্ষেত্রেই রক্তচাপের মাত্রা বজায় রাখার পাশাপাশি হৃদস্পন্দনেও সহায়তা করে।
  • এটি রক্তে উপস্থিত ইলেক্ট্রোলাইটের টিস্যুতে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে, পাশাপাশি শরীরকে দক্ষতার সাথে কাজ করে।
  • এটি পেটে বা পায়ে ক্র্যাম্প হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস করে, যা আরাম উন্নত করে।
  • এটি স্নায়ুতন্ত্রকে স্থিতিশীল করে, মোটর ফাংশন এবং সমন্বয় উন্নতি করে।

৪. নাশপাতিতে ভিটামিন এ থাকে

নাশপাতি ভিটামিন এ-তে প্রচুর পরিমাণে সমৃদ্ধ, একটি পুষ্টি যা প্রথম ত্রৈমাসিক থেকে প্রসবের আগে পর্যন্ত গর্ভাবস্থায় বেশ প্রয়োজনীয়। এই পুষ্টির ঘাটতি গর্ভাবস্থায় গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এর সুবিধার মধ্যে রয়েছে:

  • ভিটামিন এ সংক্রামক রোগগুলির সংক্রমণের সম্ভাবনা হ্রাস করে, অন্যান্য পুষ্টির সাথে একযোগে সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে সহায়তা করে। এটি বিটা ক্যারোটিন থেকে প্রাপ্ত যা রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়া থেকে আসা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হয়।
  • এটি ভ্রূণের চোখের বিকাশ এবং মায়ের চোখের স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য দৃষ্টিশক্তির গুণমান উন্নত করে বলে পরিচিত।
  • ভিটামিন এ ভ্রূণের বৃদ্ধি এবং বিকাশকে প্রভাবিত করতে পরিচিত, উদাহরণস্বরূপ, শ্বসনতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, সংবহনতন্ত্র এবং এই জাতীয় ভিটামিন দ্বারা ভ্রূণের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়াও, কিডনি এবং হাড়ের মতো অঙ্গগুলিরও সঠিক বিকাশের জন্যও এটি প্রয়োজন।

৫. নাশপাতিতে কপার এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকে

কপার এবং ম্যাগনেসিয়াম হল প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট যা গর্ভাবস্থায় বড় ভূমিকা পালন করে। এর কিছু উপকারিতা হল:

  • কপার, আয়রনও বি-ভিটামিনের পাশাপাশি লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। এটি গুরত্বপূর্ণ, কারণ গর্ভবতী নয় এমন প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলাদের চেয়ে গর্ভবতীদের প্রায় এক লিটার রক্ত বেশি ​​থাকে।
  • কপার বিভিন্ন অঙ্গ এবং সিস্টেমের বিকাশে সহায়ক, যেমন হাড়, যকৃৎ, রক্তনালীগুলি ইত্যাদি।
  • কঙ্কাল (হাড়ের কাঠামো) সিস্টেমের অবিচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কপার প্রয়োজন, যার ফলে শরীর শক্তিশালী হয়।
  • গর্ভাবস্থায় শরীরের পেশী শিথিল করার জন্য ম্যাগনেসিয়াম অপরিহার্য, যার ফলে শারীরিক চাপ এবং ক্লান্তি হ্রাস পায়।

৬. নাশপাতির মধ্যে ফাইবার থাকে

হজম তন্ত্রের সঠিক কাজকর্মের জন্য ফাইবার বেশ প্রয়োজনীয়। এর কিছু উপকারিতা হল:

  • বিস্তৃত জরায়ু দ্বারা সৃষ্ট স্থান সংকোচনের কারণে গর্ভবতী মহিলারা অনেক হজম সমস্যার সম্মুখীন হন। একটি ফাইবার সমৃদ্ধ ডায়েট কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো জটিলতাগুলি সমাধান করতে সহায়তা করবে।
  • গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে ফাইবার গ্রহণকে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সাথে যুক্ত করা হয়, যেমন গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ। এটি প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার মতো অবস্থার বিকাশের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে।

নাশপাতির মধ্যে ফাইবার থাকে

৭. নাশপাতি ভিটামিন বি৬ সমৃদ্ধ

বি-ভিটামিন গর্ভবতী মহিলাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির একটি সেট, এর ঘাটতিতে ভ্রূণের ত্রুটি দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিটামিন হল ভিটামিন বি৬। এর উপকারিতার মধ্যে রয়েছে:

  • ভিটামিন বি৬ ভ্রূণ এবং নবজাতকের জ্ঞানীয় ও মোটর ফাংশন বিকাশকে সমর্থন করে। এটি ভ্রূণের নার্ভ টিস্যু বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে।
  • এটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়াগুলি নিয়ন্ত্রণ করে শরীরকে সুস্থ রাখে।
  • এটি গর্ভাবস্থার লক্ষণগুলির ঘনত্বকে হ্রাস করে, যেমন বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া, যা গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে ঘটে।

৮. নাশপাতির মধ্যে ফলিক অ্যাসিড থাকে

ফলিক অ্যাসিড ভ্রূণের বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয়। এর কিছু উপকারিতা হল:

  • ফলিক অ্যাসিড রক্ত ​​উত্পাদন এবং রক্ত সংবহনতন্ত্রের উন্নয়নে সহায়তা করে।
  • এটি নিউরাল টিউব বিকাশের ক্ষেত্রেও সহায়তা করে যা শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ।

নাশপাতি বাছাই এবং সংরক্ষণ করবেন কিভাবে?

সমস্ত ফলের মতো, নাশপাতিগুলি খাওয়ার আগে সঠিকভাবে বাছাই করতে হবে। আপনাকে সেরা এবং স্বাদযুক্ত নাশপাতিগুলি বাছতে সহায়তা করার জন্য এখানে কয়েকটি মানদণ্ড দেওয়া হল।

  • আকার এবং গন্ধ: নাশপাতির খোসায় কোনও দাগ, ক্ষত বা চিহ্ন ছাড়াই সতেজ হওয়া উচিত। এগুলিতে ফলের মতো সুগন্ধ এবং ক্ষুধাবর্ধক গন্ধ থাকা উচিত। অন্য কোন আকার বা গন্ধ ইঙ্গিত করতে পারে যে নাশপাতিগুলি খুব দীর্ঘ সময়ের জন্য স্টোরেজে রাখা হয়েছিল।
  • সংরক্ষণ: নাশপাতিগুলি ফ্রিজে রাখা যেতে পারে, তবে ব্রাউন পেপার ব্যাগে আলাদা করে রাখা জরুরি। এর কারণ হল নাশপাতিগুলির নিকটে উগ্র গন্ধযুক্ত যে কোনও খাবারের গন্ধ এই ফল শোষণ করতে পারে। নাশপাতিগুলি আদর্শভাবে সঞ্চয় করার এক সপ্তাহের মধ্যেখেয়ে নিতে হয়। অপক্ক নাশপাতিগুলি কয়েক দিনের জন্য ঘরের তাপমাত্রায় অন্ধকারে রাখা যেতে পারে, এর পরে তারা পাকা হবে।
  • খাওয়া: খাবার খাওয়ার কয়েক ঘন্টা পরে নাশপাতি ভালভাবে খাওয়া যায়। এর কারণ হল নাশপাতিতে থাকা অ্যাসিডগুলি খালি পেটের অভ্যন্তরের টিস্যুর আস্তরণে সমস্যা করতে পারে এবং ডায়রিয়া ও বমি বমিভাব ঘটায়। তাছাড়া, নাশপাতি এবং তাজা দুধের সংমিশ্রণের ফলে একটি রেচকগত প্রভাব দেখা দেয়, সুতরাং এটি এড়ানো উচিত।

আপনার গর্ভাবস্থা ডায়েটে নাশপাতি ফল যুক্ত করা

এগুলিকে টাটকা হিসাবে খাওয়ার পাশাপাশি, আপনি নাশপাতি খেতে পারেন এমন কিছু নাটকীয় উপায় এখানে রয়েছে।

  • বেকড পিয়ার্স: নাশপাতিগুলিতে মধু, কাঠবাদাম, দারুচিনি এবং ব্রাউন সুগার দিয়ে ওভেনে বেক করা যায়। ১৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রা সেট করুন এবং প্রতিটি দিক সোনালি বাদামী হওয়া পর্যন্ত ১৫ মিনিট বেক করুন।

আপনার গর্ভাবস্থা ডায়েটে নাশপাতি ফল যুক্ত করা

  • নাশপাতির সালাদ: নাশপাতি আপনার প্রিয় ফলের সাথে একত্রিত করা যায় এবং একটি সুস্বাদু সালাদ তৈরি করা যায়। মুচমুচে করতে এবং স্বাদ বাড়ানোর জন্য কাঠবাদাম ও মধু যোগ করুন।
  • নাশপাতির রস: নাশপাতি একটি মিক্সারে দিয়ে তাজা রস তৈরি করে খাওয়া যায় এবং তাজা তাজা পান করা যায়, বা আপেল, গাজর এবং আদা মিশ্রিত করে একটি ফলের মকটেল তৈরি করতে পারেন।

নাশপাতি কখন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?

নাশপাতি বেশিরভাগ পরিস্থিতিতে খাওয়া নিরাপদ, তবে কিছু ঝুঁকিও বিবেচনা করা উচিত:

  • বেশি পরিমাণে নাশপাতি খেলে গ্যাসের বৃদ্ধি, ডায়রিয়া এবং বমি বমিভাবের মতো গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হতে পারে।
  • ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে বেশি পরিমাণে নাশপাতি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • কাঁচা নাশপাতিগুলিতে শক্ত ফাইবার থাকে যা পেটের সমস্যা তৈরি করতে পারে, তাই কেবল পাকা নাশপাতিগুলি খান যা হলুদ বা কমলা বর্ণের হয়।

নাশপাতি সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং স্বাস্থ্যকর ফলের মধ্যে একটি। এগুলি খুব পুষ্টিকর, বিশেষত গর্ভবতী মহিলাদের জন্য। উপরে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী আপনি যতক্ষণ সামান্য সতর্কতামূলক পদক্ষেপের সাথে সেগুলি খান ততক্ষণ কোন গর্ভবতী মহিলারই এই প্রশ্নে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই, আমরা কি গর্ভাবস্থায় নাশপাতি খেতে পারি?