গর্ভাবস্থায় হেঁচকি বা হিক্কা ওঠা- কারণ এবং প্রতিকারসমূহ

গর্ভাবস্থায় হেঁচকি বা হিক্কা ওঠা

গর্ভাবস্থা একটি রোলার কোস্টারে চড়ার থেকে কোনও অংশেই কম কিছু নয়,কারণ এটি তার সাথে ক্রমাগত শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।এই সময়ে হরমোনজনিত নানাবিধ পরিবর্তনের কারণে অম্বলগলাবুক জ্বালা,ঢেকুর তোলা,গা গুলিয়ে বমি বমি ভাব,বদহজম এবং এরকম আরও বহু অস্বস্তি হয়ে থাকে।আবার বারেবারে হিক্কা বা হেঁচকি তোলার মত এই বিশিষ্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটিও বহু গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে দেখা যায়।এটি সামান্য বিরিক্তিকর হয়ে উঠতে পারে যেহেতু প্রতি কয়েক ঘন্টাতেই এই খিঁচুনিটির নিজে থেকেই পুনরাবৃত্তি হতে থাকে,যা প্রত্যহ ক্রিয়াকলাপে দিন দিন হস্তক্ষেপ করতে থাকে।

aniview

গর্ভাবস্থায় হিক্কা বা হেঁচকি ওঠার মানে কি?

সাধারণত প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষে এবং দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের প্রারম্ভিক দিনগুলিতে,বহু প্রত্যাশিত মায়েরাই বারংবার হয়ে থাকা হেঁচকি অনুভব করে থাকেন,প্রাথমিকভাবে এটি একটি স্বাভাবিক এবং সাধারণ ঘটমান বিষয়।যদিও বারংবার হেঁচকির এই পুনরাবৃত্তি হওয়া অত্যন্ত বিরক্তকর একটি ব্যাপার,কিন্তু এটি দেহে কোনওরকম সমস্যাকে সূচিত করে না এবং এতে বড় ধরণের কোনও উদ্বেগেরও কারণ নেই।হ্রস্ব শ্বাস এবং অযথাযথ খাদ্যাভ্যাসের কারণে গর্ভাবস্থায় প্রায় ঘন ঘনই হেঁচকি ওঠার প্রবণতা দেখা দেয় এবং এটিকে এড়িয়ে যাওয়া যেতে পারে আরও বেশী নিরুদ্বেগ এবং ধীর সম্পন্না হওয়ার মধ্য দিয়ে,বিশেষ করে খাওয়ার সময়।

হিক্কা বা হেঁচকি ওঠার কারণগুলি

গর্ভবতী মহিলারা তাদের গর্ভাবস্থায় কেন হেঁচকি বা হিক্কা ওঠা অনুভব করে থাকেন তার অনেকগুলি কারণ আছে।সেগুলির মধ্যে কয়েকটি হলঃ

  • অতিরিক্ত অক্সিজেন:

সাধারণত গর্ভাবস্থায় মহিলাদের বায়ুতে শ্বাস গ্রহণ করার ক্ষমতা প্রায় 30% থেকে 40% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।দেহস্থ ভ্রূণে অক্সিজেন সরবরাহ করার জন্য এটি দেহের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে অক্সিজেন গ্রহণের এই হঠাৎ বৃদ্ধি মায়ের মধ্যে শ্বাসকষ্ট-বোধ তৈরী করে।এই হ্রস্ব শ্বাস বা শ্বাসকষ্ট সাধারণত ডায়াফ্রাম বা মধ্যচ্ছদায় একটি খিঁচুনির প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে, যা হিক্কা বা হেঁচকি হিসাবে পরিচিত

  • অ্যাসিড রিফ্লাক্স:

আভ্যন্তরীণ পাচন অঙ্গাণুর সংকোচনের কারণে গর্ভাবস্থায় অ্যাসিড রিফ্লাক্স ঘটে থাকা একটি সাধারণ ঘটমান বিষয়।অনেক সময়েই অতি দ্রুততার সাথে কোনও কিছু খাওয়া বা পান করার প্রবণতা এই হেঁচকি তোলার পর্বটিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে,সেই জন্যই ডাক্তাররা সাধারণত প্রত্যাশী গর্ভবতী মায়েদের শান্ত হয়ে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে নমনীয় পন্থায় খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

অ্যাসিড রিফ্লাক্স

  • আত্মসচেতন

অনেক মহিলাই বিশ্বাস করেন যে,হেঁচকি ওঠা হল স্বাস্থ্যকর গর্ভাবস্থার লক্ষণ।এই তত্ত্বটি তাদের আরও স্বপর্যবেক্ষক এবং তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের ধরণটি লক্ষ্য করার ক্ষেত্রে নিয়মিত সচেতন করে তোলে। যখন তারা বারংবার হেঁচকি তুলতে থাকে, তারা এ্টির প্রতি তাদের মনোযোগকে এত বেশী কেন্দ্রীভূত করে যে তারা এটিকে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘায়িত করে শেষ করে।কম মনোযোগ দেওয়া এবং মনটিকে এটির থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা কখনও কখনও এটিকে বন্ধ করতে সাহায্য করে।

ভ্রূণের হেঁচকি কি?

দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের আশেপাশে, মায়েরা তাদের বেবি বাম্পে বেশ কয়েকটি হালকা মানের ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।এই ঝাঁকুনির প্রথম কয়েক বার মাকেও বেশ চিন্তিত করে তুলতে পারে,এটির কারণে কিছু ধরনের অসুবিধা হয়ত শিশুটি ভোগ করছে এমন ধরনের ভুল চিন্তা সাধারণতই হয়ে থাকে।সময়ের সাথে সাথে এই ঝাঁকুনিটির পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং তা আরও ঘন ঘন হতে শুরু করে।গর্ভের অভ্যন্তরে শিশুটি বারংবার হেঁচকির তোলার অনুভব করা ছাড়া এটি আর কিছুই নয়।

শিশুটি যখন অ্যামনিয়োটিক তরলে ভাসতে থাকে, তখন এটির সামান্য অংশ গিলে ফেলার প্রবণতা থাকে।তখন এই তরলটি ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং শিশুটি এই খিঁচুনিগুলির দ্বারা সেই তরলটিকে ঠেলে বের করে দেয়।এটি একটি প্রাকৃতিক ঘটমান বিষয় যা কোনওভাবেই শিশুর অক্সিজেন সরবরাহকে প্রভাবিত করে না, যেহেতু এটি প্লাসেন্টা বা অমরার মাধ্যমে মায়ের কাছ থেকে গ্রহণ করে। আসলে, ভ্রূণের নিয়মিত হেঁচকি ওঠাগুলি শিশুর সুস্থ বিকাশের লক্ষণ কারণ এর প্রতিপ্রবাহগুলি মায়ের দেহের অভ্যন্তরেই বিকাশলাভ করে।গর্ভাবস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিকে, হেঁচকিগুলি তুঙ্গে ওঠে এবং মায়ের পক্ষে এর একটি নিদর্শন লক্ষ্য করা খুব উত্তেজনাপূর্ণময় হয়ে উঠতে পারে।

হেঁচকির সাথে মোকাবিলা করার উপায়গুলি

এক্ষেত্রে বেশ কিছু ভাল প্রাচীন প্রতিকার রয়েছে যেগুলি হেঁচকি ওঠার থেকে মুক্তি পাওয়ার কাজ করে।এগুলি প্রাথমিক গর্ভাবস্থায় হেঁচকি নিয়ন্ত্রণের জন্য ভীষণ নিরাপদ এবং কৌশলে অবিলম্বে এই খিঁচুনিগুলি থামাতে পারে।

  • জল পান করুনঃ হেঁচকির জন্য এটি খুবই সাধারণ এবং সুপরিচিত একটি প্রতিকার।এই কৌশলটির পিছনে ধারণাটি হল এক বারে সম্পূর্ণ এক গ্লাস জল পান করা।কোনওরকম বিরতি না দিয়ে টানা একবারে সম্পূর্ণ এক গ্লাস জল পান করলে তা অজ্ঞাতসারেই অল্প কিছু সময়ের জন্য আমাদের শ্বাসকে ধরে রাখে।এর ফলে এটি হেঁচকি ওঠার কারণে মধ্যচ্ছদার খিঁচুনিকে হ্রাস করে।জল দিয়ে গার্গেল করলেও তা হেঁচকি ওঠাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে।
  • গভীর শ্বাস নিনঃ গভীরভাবে শ্বাস গ্রহণ করতে,একবার প্রশ্বাস গ্রহণ করে সেটিকে ধরে রাখুন যতক্ষণ আপনি পারেন,হঠাৎ করেই হেঁচকি ওঠার খিঁচুনিগুলি বন্ধ হয়ে যাবে।এই কৌশলটি ফুসফুসকে পূর্ণ করে এবং ডায়াফ্রাম বা মধ্যচ্ছদার আলোড়নকে পরিমিত করে।এই প্রক্রিয়াটিতে যাতে দম বন্ধ না হয়ে যায় সে ব্যাপারে অবশ্যই যত্ন নেওয়া উচিত।ফুসফুসকে ব্যস্ত রাখার জন্য আপনি আবার শ্বাস প্রশ্বাসের অন্যান্য ব্যায়ামগুলিও অনুশীলন করতে পারেন।একটি কাগজের ব্যাগের ভিতরে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়াও এমন একটি কৌশল যেটি অনুসরণ করা যেতে পারে।
  • লেবু এবং আদাঃ এটি বিশ্বাস করা হয় যে লেবু এবং আদার মত তীব্র স্বাদ ও গন্ধযুক্ত কোনওকিছুর এক টুকরো যদি মুখের মধ্যে রেখে চোষা হয়ে থাকে তবে সেটি হেঁচকি তোলার পর্বে বিরতি আনতে পারে।লেবু,আদা এবং মধু দ্বারা প্রস্তুত একটি পানীয়ও এক্ষেত্রে অদ্ভুতভাবে কাজ করে।কার্যকর ফলাফল পেতে পুনরায়,কেবল জল পানের মতই,এই রসটিকেও একবারে এক চান্সে গ্রহণ করতে হবে।

লেবু এবং আদা

  • চিনিঃ এক চামচ পূর্ণ করে চিনি গিলে নেওয়াও হেঁচকির জন্য একটি দ্রুত প্রতিকার।এই পদ্ধতিটি অদ্ভুতভাবে কাজ করে মধ্যচ্ছদা বা ডায়াফ্রামে প্রবর্তিত হওয়া খিঁচুনি থেকে মনকে বিক্ষিপ্ত করতে।জিহ্বার তলায় উপস্থিত ভেগাস নার্ভ কোনওকিছু মিষ্টি খাবার গ্রহণের সংকেত গ্রহণ করে এবং এটির সম্পর্কে মস্তিষ্কে একটি সংকেত প্রেরণ করে।এটি হেঁচকি তোলা থেকে মনোযোগটিকে স্থানান্তরিত করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এটি থেকে বিরত থাকে।
  • আপনার জিহ্বাটিকে বের করে রাখুনঃ আপনার জিহ্বাটিকে বাইরে বের করে নিশ্চল করে রাখুন এবং তার সাথে একইসঙ্গে আপনার কানগুলিকে বন্ধ করা হেঁচকির উপর যাদুমন্ত্রের মত কাজ করে।এই পদ্ধতিতে আপনি গভীরভাবে প্রশ্বাস নিতে পারেন এবং মধ্যচ্ছদা বা ডা্যাফ্রামের আলোড়নকে সীমিত করতে শ্বাস ত্যাগ করুন।
  • ঘাড় নত করুনঃ নাসাপথ বন্ধ করার পরিবর্তে আপনি যতটা সম্ভব আপনার ঘাড় বাঁকিয়ে নিচু করে আপনার শ্বাসনালীর মাধ্যমে বায়ু প্রবাহকে সীমিত করতে পারেন। এটি খিঁচুনিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনে।
  • ভিনিগার পান করুনঃ হেঁচকি বন্ধ করতে কয়রক চামচ ভিনিগার গ্রহণ করা যেতে পারে।এটি আম্লিক হওয়ার কারণে,এটি মায়ের মধ্যে অম্বল,গলাবুক জ্বালার কারণ হতে পারে।সুতরাং,এটি সংযমের সাথে নিতে হবে।

হেঁচকি ওঠা হল এক সামান্য অস্বস্তি যা গর্ভাবস্থার সাথে আসে।হয় মা অথবা সন্তানের সাথে হতে পারে এমন কোনও গুরুতর সমস্যাকে এগুলি সূচিত করে না এবং কেবলমাত্র কিছু শারীরিক পরিবর্তনের জন্য শরীরের সামাল দেওয়ার প্রক্রিয়াটিকে প্রতিফলিত করে।কিছু প্রাকৃতিক প্রতিকারের সাথে,একটি সুন্দর গর্ভাবস্থাকে উপভোগের পথ থেকে এই অস্বস্তিগুলিকে অপসারিত করা যেতে পারে।