গর্ভাবস্থায় যোনি স্রাব

গর্ভাবস্থায় যোনি স্রাব

লিউকোরিয়া হ’ল যোনি স্রাবকে, বিশেষ করে যা গর্ভাবস্থায় ঘটে, বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত চিকিৎসা শব্দ। লিউকোরিয়া একটি পুরু সাদা বা হলুদাভ যোনি স্রাব যা গর্ভবতী মহিলাদের তাদের পিরিয়ডের পরিবর্তে হয় এবং সাধারণত ক্ষতিকারক নয়। তা, এই সাদা স্রাবের কারণ কী কী, কী স্বাভাবিক এবং কী অস্বাভাবিক – আমরা আপনাকে এই সব সম্পর্কে এবং আরও অনেক কিছু বলব!

aniview

যোনি স্রাব কী?

প্রায় প্রতি মহিলা জীবনে কখনো না কখনো যোনি স্রাবের মুখোমুখি হয়। বেশিরভাগ সময় যোনি স্রাব স্বাভাবিক এবং কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। এই স্রাবের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল মাসিক চক্রের সময় হরমোন মাত্রার পরিবর্তন; ডিম্বস্ফোটন ঘটলে, এই স্রাবের ঘনত্বের পরিবর্তন হয়। যখন কোনো মহিলার ডিম্বস্ফোটন হয় না, তখন যোনি স্রাব পুরু এবং চটচটে হয়। যখন আপনার ডিম্বস্ফোটন হওয়ার সময় হয় এবং ডিম্বস্ফোটন চলাকালীন, এই একই স্রাব একটি পাতলা এবং প্রসারণ যোগ্য ঝিল্লিতে রূপান্তরিত হয় যা শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর দিকে যেতে সাহায্য করে। এটি কয়েক দিনের জন্য বা এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, যোনি স্রাব সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার কিছু নেই এবং যতক্ষণ না এটি জ্বালা, অস্বস্তি, বাজে গন্ধ এবং চুলকানি সৃষ্টি করে, ততক্ষণ এটিকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।

এখানে নারীর যোনি স্রাবের সকল সম্ভাব্য কারণগুলি রয়েছে:

  • মাসিক চক্রের সময় হরমোনের পরিবর্তন
  • গর্ভাবস্থা
  • যোনিতে সংক্রমণ, বিশেষ করে ঈস্ট সংক্রমণ
  • ডুশ, সাবান, লোশন বা পাউডারে এলার্জি
  • এসটিডি বা যৌন সংক্রামিত রোগ
  • ট্রিকোমোনিয়াসিস- একটি পরজীবি সংক্রমণ যা অরক্ষিত যৌন সংসর্গের সময় শুরু হয়ে থাকতে পারে
  • পেলভিক সংক্রমণ
  • অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েডের ব্যবহার
  • একটি ট্যামপুন অনেকক্ষণ ধরে রেখে দেওয়া বা আপনার অন্তর্বাস প্রায়ই পরিবর্তন না করার মতো অস্বাস্থ্যকর অবস্থা
  • জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা খাওয়ার গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা
  • ডায়াবেটিস বা অন্যান্য বিপাকীয় রোগ
  • রজোবন্ধ
  • যোনিতে আঘাত বা ক্ষত
  • ভ্যাজিনাইটিস, বা যোনির চারপাশে জ্বালা
  • সার্ভিকাল ক্যান্সার

গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক যোনি স্রাবকে লিউকোরিয়া বলা হয়। এটি আপনার সার্ভিক্স থেকে আসে, যা আপনার জরায়ুর গলা বা শিশুর গর্ভ হিসাবে বেশী পরিচিত।

গর্ভাবস্থায় সাদা স্রাব কি স্বাভাবিক?

গর্ভবতী হওয়ার সময় বেশী যোনি স্রাব হওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক বলে যা মনে করা হয় তা হল গন্ধহীন বা হালকা-গন্ধযুক্ত পুরু ক্রিমের মতো সাদা স্রাব বা দুধ-সাদা যোনি স্রাব। তবে, যখন এটি রঙ পরিবর্তন করে, তখন এটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় যে যোনি স্রাব আপনি দেখতে পারেন তা আপনার দুটি পিরিয়ডের অন্তর্বর্তী সময়ে দেখা যোনি স্রাবের খুব অনুরূপ হয়, কেবলমাত্র ভারী হতে পারে। এটি গর্ভাবস্থার একটি প্রীতিকর উপসর্গ না হতে পারে, কিন্তু এটি আপনার গর্ভাবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে বাড়বেই!

গর্ভাবস্থার সময় স্রাব

গর্ভাবস্থার সময় স্রাব

গর্ভবতী না হওয়া বেশিরভাগ মহিলারাও তাদের চক্রের মাঝখানে কিছু স্রাব দেখতে পান, কিন্তু যখন আপনি গর্ভবতী হন, তখন সেই স্রাব বাড়তে পারে। এটি গর্ভাবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ যা গর্ভাবস্থার 13 তম সপ্তাহে শুরু হতে পারে, যা প্রায় আপনার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের শুরু। আপনার গর্ভাবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে, স্রাব বাড়বেই। আপনার যোনিটি আপনার সার্ভিক্সকে আর্দ্র ও স্বাস্থ্যকর রাখতে অতিরিক্ত সময় ধরে কাজ করছে, এবং এটি তার একটি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া!

সুতরাং, এই স্রাবের উদ্দেশ্য কী, আপনি হয়তো জিজ্ঞাসা করতে পারেন? এটি জন্ম নালীকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং যোনিতে ভালো ব্যাকটেরিয়া এবং ফ্লোরার সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখে। কখনও কখনও, স্রাব সামান্য বাদামী বা গোলাপী হতে পারে। আপনার মাঝে মাঝে যোনি স্পট হওয়া ছাড়া, অন্য রক্তপাত না হলে এটি স্বাভাবিক।

আসুন আমরা গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে যোনি স্রাবের ধরণ নিয়ে আলোচনা করি:

1. প্রথম ত্রৈমাসিক

সাধারণ বা ন্যূনতম যোনি স্রাব যাতে আপনি অভ্যস্ত। কিছু ক্ষেত্রে, কোনো স্রাব না হতে পারে।

2. দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক

গর্ভাবস্থার সাথে যুক্ত যোনি স্রাব বা লিউকোরিয়া সাধারণত গর্ভধারণের 13তম সপ্তাহে, দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে শুরু হয়। আপনি এতদিন ধরে যা দেখে আসছেন তার চেয়ে স্রাবের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে এবং সম্ভবত প্রতি সপ্তাহে বা এমনকি প্রতি দিনে বৃদ্ধি পাবে!

3. তৃতীয় ত্রৈমাসিক

যোনি স্রাব খুব ভারী এবং অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে এবং সম্ভবত প্রসব শ্রমের কাছে যাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

যোনি স্রাবের কারণ

এখানে যোনি স্রাবের সাথে যুক্ত সাধারণ কিছু কারণ রয়েছে:

1. হরমোন পরিবর্তন

মাসিক চক্রের সময় একজন মহিলার শরীর অনেক হরমোন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। পিরিয়ড চক্রের প্রথমার্ধে, এস্ট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ডিম্বস্ফোটনের সময় তুঙ্গে ওঠে। এই হরমোনটি যেহেতু রক্তের সরবরাহ বাড়ায়, তাই এটি সার্ভিক্স থেকে বর্ণহীন এবং গন্ধহীন ক্ষরণের বৃদ্ধি ঘটায় যা স্রাব ছাড়া আর কিছুই নয়। এই স্রাব বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিহীন।

  • উপসর্গ: ডিম্বস্ফোটনের পরে স্রাবের পরিমাণ বৃদ্ধি হয়, চক্রের অগ্রগতির সাথে সাথে যা পরিবর্তিত হয়।
  • এটা কি স্বাভাবিক: নিঃসন্দেহে স্বাভাবিক, যতক্ষণ না স্রাব রঙিন বা খারাপ-গন্ধ যুক্ত হয়।
  • কিভাবে এটি মোকাবিলা করতে হবে: এলাকাটি শুষ্ক রাখুন, প্যান্টি লাইনার ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত আপনার অন্তর্বাস পরিবর্তন করুন।

2. গর্ভাবস্থা

গর্ভাবস্থার সাথে যোনি স্রাবের অপ্রীতিকর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আসে। এস্ট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় যার ফলে মিউকাসের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, ফলে লিউকোরিয়া দেখা দেয়।  আপনার পিরিয়ডের সময় যে স্রাবের অভিজ্ঞতা হয়, এটি তার অনুরূপ, তবে তার উপস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে। তাছাড়া, এটি গর্ভাবস্থার পুরো সময়কাল ধরেও উপস্থিত হতে পারে কারণ এটি যেকোনো সংক্রমণ থেকে জন্ম নালীকে রক্ষা করে এবং এই অঞ্চলে সুস্থ ব্যাকটেরিয়া বজায় রাখে।

  • উপসর্গ: প্রথম ত্রৈমাসিকে স্রাবের কোনো বৃদ্ধি হয় না, তবে দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের পরে গর্ভাবস্থা যত প্রসব সময়ের কাছাকাছি এগিয়ে যায়, তত এটি বৃদ্ধি পায়।
  • এটা কি স্বাভাবিক?: গর্ভবতী হলে যোনি স্রাব বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক।
  • কিভাবে এটি মোকাবিলা করতে হবে: স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখুন এবং যোনি এলাকা শুষ্ক রাখুন। সেরা সমাধানের জন্য আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন, নিজে নিজে ওষুধ খাবেন না।

3. ঈস্ট সংক্রমণ

ঈস্ট সংক্রমণ

একটি ঈস্ট সংক্রমণ কদর্য হতে পারে, কিন্তু ভালো ব্যাপার হল যে এটি সনাক্ত করা সহজ। এটি একটি ছত্রাক সংক্রমণ যা যোনি অঞ্চলে খুব বেশী দেখা যায় যা যোনিতে ঈস্ট কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি নির্দেশ করে যা পিএইচ ভারসাম্যকে ব্যাহত করে এবং অস্বস্তি সৃষ্টি করে।

  • উপসর্গ: যোনি স্রাব সাদা বা হলুদ, এবং কটেজ পনিরের অনুরূপ হতে পারে। এটির একটি কদর্য গন্ধও থাকতে পারে, এবং এলাকাটিতে খুব চুলকানি হতে পারে।
  • এটা কি স্বাভাবিক?: এটা সাধারণ, কিন্তু স্বাভাবিক নয়।
  • কিভাবে এটি মোকাবিলা করতে হবে: আপনার যোনিকে বাতাস মুক্ত করুন এবং এটিকে শুষ্ক রাখা চেষ্টা করুন। চিনি খাওয়া কমান এবং আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন, যিনি খাওয়ার বা ত্বকের উপরে লাগানোর জন্য কিছু ঔষধ দিতে পারেন।

4. এলার্জি প্রতিক্রিয়া

আপনি যতটা ভাবেন তার চেয়ে এগুলি বেশি সাধারণ! একটি ফ্যাব্রিক বা সাবান থেকে এলার্জির কারণে ঘটতে পারে।

  • উপসর্গ: যোনিতে চুলকানির সাথে জ্বলে যাওয়ার অনুভূতি হতে পারে। এলাকাটি ফুলে যেতে বা লাল হয়ে যেতে পারে, সাথে একটি বাজে গন্ধ যুক্ত পুরু স্রাব থাকতে পারে।
  • এটা কি স্বাভাবিক?: স্বাভাবিক না, কিন্তু কারণ চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
  • কিভাবে এটি মোকাবিলা করতে হবে: কারণটি চিহ্নিত করুন এবং এটির সাথে যোনি এলাকাটির যোগাযোগ বন্ধ করুন। উপযুক্ত ঔষধের জন্য আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

5. যৌন সংক্রামিত রোগ

অনেকগুলি এসটিডি আছে এবং কয়েকটিতে বেশী পরিমাণে যোনি স্রাব হয়।

  • উপসর্গ: পুরু, হলুদ যোনি স্রাব, সাথে তীব্র চুলকানি, এবং ফুসকুড়ি বা ব্রণ হতে পারে।
  • এটা কি স্বাভাবিক?: স্বাভাবিক না, এবং এটি আরও ছড়িয়ে পড়ার আগে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন।
  • কিভাবে এটি মোকাবিলা করতে হবে: আপনাকে শুধুমাত্র ডাক্তারের উপর নির্ভর করতে হবে, যিনি কয়েকটি পরীক্ষা চালাতে পারেন এবং চিকিৎসার কোর্সটি নির্ধারণ করতে পারেন।

6. ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

জন্মনিয়ন্ত্রক ঔষধগুলির মতো অনেকগুলি ঔষধও ওই অঞ্চলের সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিতে পারে। এছাড়াও, গর্ভনিরোধের জন্য ব্যবহৃত মলম এবং জেলি প্রয়োগের ফলে শ্লেষ্মার স্তরকে বিঘ্নিত করতে পারে যার ফলে স্রাব সৃষ্টি হতে পারে।

  • উপসর্গ: ঘন স্রাব, যার সঙ্গে একটি বাজে গন্ধথাকতে পারে।
  • এটা কি স্বাভাবিক?: যতক্ষণ স্রাবটিতে খুব বেশি গন্ধ না হয়, ততক্ষণ চিন্তা করার কোনো কারণ নেই এবং নির্দিষ্ট ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসাবে এলে এটি একেবারে স্বাভাবিক।
  • কিভাবে এটি মোকাবিলা করতে হবে: এলাকাটিকে শুষ্ক এবং স্বাস্থ্যকর রাখুন। অতিরিক্ত স্রাব শুষে নেওয়ার জন্য প্যান্টি লাইনার ব্যবহার করুন।

7. ট্রাইকোমোনিয়াসিস

এটি ট্রাইকোমোনাস ভ্যাজিনালিস নামের একটি পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট হয় এবং এইচআইভি / এইডস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

  • উপসর্গ: একটি পাতলা, বাজে-গন্ধযুক্ত স্রাবের সাথে যোনিতে চুলিকানি হয়। প্রস্রাব এবং যৌন সংসর্গের সময় ব্যথা বা জ্বলন হতে পারে।
  • এটা কি স্বাভাবিক?: না,এটা স্বাভাবিক না, এবং অবিলম্বে চিকিৎসা করা আবশ্যক।
  • কিভাবে এটি মোকাবিলা করতে হবে: এটি আপনার ডাক্তারের মনোযোগে আনুন, যিনি কিছু পরীক্ষা চালাতে পারেন এবং সমস্যার নির্ণয় করতে পারেন।

অস্বাভাবিক যোনি স্রাবের প্রকারভেদ এবং তাদের উপসর্গ

প্রাথমিক গর্ভাবস্থায় বাদামী স্রাব সাধারণত চিন্তার কারণ নয় যতক্ষণ এটি শুধু যোনি স্পটিং-এ সীমিত থাকে, কিন্তু গর্ভাবস্থায় হলুদ স্রাব যা পুরু এবং চিজ-এর মতো এবং যাতে খুব বাজে গন্ধ থাকে, সেটি একটি যোনি সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে। চুলকানি বা সাদা স্রাবও কিছু খারাপের ইঙ্গিত দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে, আপনার চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে এবং আপনার ডাক্তারের মনোযোগে এটি আনতে হবে।

এখানে গর্ভবতী থাকার সময় কোনটি স্বাভাবিক স্রাব এবং কোনটি অস্বাভাবিক তা বোঝার জন্য একটি দ্রুত তালিকা দেওয়া হল।

যোনি স্রাবের প্রকার স্বাভাবিক / অস্বাভাবিক সংকেত
পরিষ্কার স্বাভাবিক সুস্থ
দুধেল সাদা স্বাভাবিক সুস্থ
গন্ধহীন স্বাভাবিক সুস্থ
বাদামী / লালচে বা গোলাপী স্বাভাবিক সুস্থ, যদি শুধুমাত্র স্পটিং-এ সীমিত থাকে
হলুদাভ অস্বাভাবিক গনোরিয়ারমতোযৌনসংক্রামিতরোগবাসম্ভাব্যযোনিসংক্রমণ
সবুজাভ অস্বাভাবিক সম্ভাব্য যোনি সংক্রমণ, বিশেষ করে ট্রাইকোমোনিয়াসিস
পুরু এবং চিজ-এর মতো অস্বাভাবিক সম্ভাব্য যোনি সংক্রমণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি ঈস্ট সংক্রমণ
দুর্গন্ধযুক্ত অস্বাভাবিক সম্ভাব্য যোনি সংক্রমণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াগত ভ্যাজিনোসিস
ফেনময় অস্বাভাবিক সম্ভাব্য যোনি সংক্রমণ
চুলকানি যুক্ত অস্বাভাবিক সম্ভাব্য যোনি সংক্রমণ
জ্বলনের অনুভূতি অস্বাভাবিক সম্ভাব্য যোনি সংক্রমণ
দ্রুত বৃদ্ধি, অত্যন্ত জলময় অস্বাভাবিক অ্যামনিওটিক তরলের সম্ভাব্য লিক

গর্ভাবস্থায় বাড়তি যোনি স্রাব এবং অ্যামনিওটিক তরল লিক করার মধ্যে তফাত করা আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা। যদি আপনি এখনও 37 সপ্তাহে না এসে থাকেন এবং স্রাবের পরিমাণে দ্রুত বৃদ্ধি লক্ষ্য করেন অথবা এটি খুব জলময় হয়ে উঠলে, এটি অকাল প্রসব শ্রমের একটি চিহ্ন হতে পারে এবং তা আপনার ডাক্তারের মনোযোগে আনতে হবে।

গর্ভাবস্থায় কিভাবে লিউকোরিয়ার চিকিৎসা করা হয়?

গর্ভাবস্থায় কিভাবে লিউকোরিয়ার চিকিৎসা করা হয়?

গর্ভাবস্থায় অস্বাভাবিক যোনি স্রাব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সনাক্ত করা উচিত এবং চিকিৎসা করা উচিত কারণ কিছু যোনি সংক্রমণে গর্ভপাত বা অকালের প্রসবের উচ্চ ঝুঁকি থাকে।

থ্রাশ বা ঈস্ট সংক্রমণ গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি বাড়ায় না কিন্তু অত্যন্ত অস্বস্তিকর হতে পারে।

অস্বাভাবিক যোনি স্রাবের জন্য যে চিকিৎসা করা হবে তা অস্বাভাবিক স্রাবের কারণের উপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, থ্রাশ বা ঈস্ট সংক্রমণগুলি সাধারণত ছত্রাক বিরোধী ঔষধ, ক্রিম বা জেল দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। ব্যাকটেরিয়াগত ভ্যাজিনোসিস অ্যান্টিবায়োটিক বড়ি বা ক্রিম দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। মেট্রোনাইডাজোল বা টিনিডাজোল নামক একটি ঔষধ সাধারণত ট্রাইকোমোনিয়াসিস চিকিৎসা করার জন্য নির্ধারিত হয়। যাইহোক, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি সন্দেহজনক যোনি সংক্রমণের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক স্রাবকে উপেক্ষা করবেন না বা নিজে নিজে ওষুধ কিনে খাবেন না কারণ এটি আপনার ভ্রূণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

যদিও কিছু যোনি স্রাবের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কিছু থাকতে পারে, তবে সমস্যাটি মোকাবেলা করতে এবং নিজেকে আরও আরামদায়ক করার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ আপনি নিতে পারেন।

এখানে গর্ভাবস্থার সময় যোনি স্রাব মোকাবিলা করার এবং গন্ধযুক্ত স্রাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একটি নির্দেশিকা রয়েছে:

  • আপনার বাইরের যৌনাঙ্গ এলাকা বা ভালভা পরিষ্কার এবং শুষ্ক রাখুন
  • যদি ভিজাভাব থেকে আপনি অস্বস্তি বোধ করেন, তবে হালকা প্যাড বা প্যান্টি লাইনার পরুন যাতে স্রাবটি শোষণ করা যায়। এগুলি যেন সুগন্ধ যুক্ত না হয় তা নিশ্চিত করুন
  • সুতির অন্তর্বাস পরুন, যা আপনার ত্বককে শ্বাস নিতে দেয়
  • আপনার অন্তর্বাস দিনে অন্তত 2-3 বার পরিবর্তন করুন
  • আপনার যৌনাঙ্গ এলাকা ধোয়ার সময় সুগন্ধহীন সাবান এবং জল ব্যবহার করুন
  • আপনার যোনি স্পর্শ করার আগে এবং পরে সঠিকভাবে আপনার হাত ধুয়ে নিন
  • যৌন মিলন করার আগে আপনার যোনিটিকে ভালভাবে-তৈলাক্ত করে নিন
  • আপনার যোনিকে সামনের দিক থেকে পেছন পর্যন্ত মুছে পরিষ্কার করুন, বিশেষত যৌন মিলন করার পরে

গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ এড়ানোর জন্য, যোনি স্রাব মোকাবিলা করার সময় আপনার যা করা উচিৎ না:

  • স্রাব শোষণ করার জন্য গর্ভাবস্থায় কোনো ট্যামপুন পরবেন না। এগুলি গর্ভবতী মহিলাদের জন্য সুপারিশ করা হয় না
  • দীর্ঘায়িত সময়ের জন্য একটি স্রাবে প্রলিপ্ত অন্তর্বাস পরবেন না, কারণ অবিরত ভিজাভাব আপনার যোনিকেসংক্রমণের প্রজনন ক্ষেত্র বানিয়ে দেবে
  • গর্ভকালীন সময় যোনি স্রাব থেকে পরিত্রাণ পেতে ডুশিং (যোনিকে ভিতর থেকে ধুয়ে দেওয়া) এড়িয়ে চলুন। গর্ভাবস্থায় ডুশিং ভাল ব্যাকটেরিয়ার সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে বিপর্যস্ত করতে পারে এবং যোনি সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এটি এমনকি যোনিতে বায়ু জোর করে প্রবেশ করাতে পারে, যা আপনার গর্ভাবস্থায় বিপজ্জনক হতে পারে
  • কোনো যোনি ওয়াইপ বা ওয়াশ ব্যবহার করবেন না। এগুলি ভালো গন্ধযুক্ত হলেও, এগুলি আপনার একান্ত ব্যক্তিগত এলাকার সূক্ষ্ম পিএইচ ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করতে পারে এবং একটি যোনি সংক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে পারে
  • গর্ভাবস্থার সময় সুগন্ধি বা যোনি ডিওডোরান্ট ব্যবহার করবেন না

কিভাবে যোনি স্রাব নির্ণয় করতে হয়

লক্ষণগুলির উপর নির্ভর করে, আপনার ডাক্তার আপনাকে স্রাব সম্পর্কে এক সারি প্রশ্ন করতে পারেন, যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণগুলি হল:

  • অস্বাভাবিক স্রাব কখন শুরু হয়েছে?
  • স্রাবের রঙ কী?
  • স্রাবের গন্ধ কিরকম?
  • স্রাবের সাথে কোনো চুলকানি আছে কী?
  • স্রাবের সাথে কোনো জ্বলনের অনুভূতি আছে কী?
  • আপনার সাম্প্রতিক যৌন ইতিহাস

আপনার উত্তরের উপর ভিত্তি করে, আপনার ডাক্তার স্রাবের নমুনা নিতে পারেন বা একটি পেপ স্মায়ার পরীক্ষা চালাতে পারেন, যেটিতে আপনার সার্ভিক্স থেকে কোষ সংগ্রহ করে আরও পরীক্ষা করা হয়।

অস্বাভাবিক যোনি স্রাবের সবচেয়ে সাধারণ কারণ, গর্ভাবস্থায় বা অন্যথায়, হল একটি যোনি সংক্রমণ। থ্রাশ, ব্যাকটেরিয়াগত ভ্যাজিনোসিস বা ট্রাইকোমোনিয়াসিস এর জন্য দায়ী হতে পারে।

যোনি স্রাবের জন্য ঘরোয়া প্রতিকার

লিউকোরিয়ার চিকিৎসা করার জন্য বিভিন্ন ওভার-দ্য-কাউন্টার এবং নির্ধারিত ওষুধ রয়েছে, তবে এটি কিছু সহজ ঘরোয়া প্রতিকারের মাধ্যমে বাড়িতেও মোকাবিলা করা যেতে পারে। তবে, আপনি গর্ভবতী থাকাকালীন অতিরিক্ত সতর্কতা নিতে মনে রাখবেন। কোনো ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহার করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে ভুলবেন না।

1. আপেল সাইডার ভিনিগার

অনেকের দ্বারা একটি অলৌকিক পণ্য হিসাবে অভিহিত, আপেল সাইডার ভিনেগার যোনি স্রাব চিকিৎসার জন্য উপযোগী বলে মনে করা হয়। এটি শরীরের প্রাকৃতিক পিএইচ ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে কাজ করে, এটির অম্লীয় বৈশিষ্ট্যগুলিকে ধন্যবাদ। এর অ্যান্টিসেপটিক বৈশিষ্ট্য যোনির ফ্লোরা পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে এবং যোনির গন্ধ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি কিভাবে ব্যবহার করবেন তা এখানে দেওয়া হল:

  • সমান পরিমাণে পাতন করা (ডিস্টিলড) জল এবং কাঁচা, অপরিস্রুত আপেল সাইডার ভিনেগার মিশ্রিত করুন। কয়েক দিনের জন্য এটি দিনে একবার বা দুইবার যোনি ধোয়ার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • দিনে একবার কাঁচা, অপরিস্রুত আপেল সাইডার ভিনেগারের এক বা দুই টেবিল চামচ মিশিয়ে এক গ্লাস জল পান করাও শরীরের পাশাপাশি যৌনাঙ্গের জন্য খুবই স্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হয়।

2. মেথি বীজ

আরেকটি খাদ্য যা শরীরের এবং যোনির প্রাকৃতিক পিএইচ-কে নিয়ন্ত্রণ করে ও বজায় রাখে তা হল – মেথি। এটি শরীরের এস্ট্রোজেনের মাত্রার উপরও প্রভাব ফেলে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এটি কিভাবে ব্যবহার করবেন তা এখানে দেওয়া আছে:

  • সারা রাত ধরে এক চা চামচ মেথি জলে ভিজিয়ে রাখুন এবং পরের দিন সকালে জলটি ছেঁকে নিন। এতে অর্ধেক চা চামচ মধু যোগ করুন এবং খালি পেটে পান করুন।
  • আপনি 30 মিনিট ধরে চার কাপ জলে দুই চা চামচ মেথি বীজ ফোটাতেও পারেন। জলটি ছেঁকে নিন এবং এটিকে ঠান্ডা হতে দিন। এই জল কয়েক দিন ধরে দিনে দুই থেকে তিন বার যোনি ধোয়ার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

3. কলা

কলা শুধুমাত্র হজমে সহায়তাই করে না, এটি যোনি স্রাব নিয়ন্ত্রণ করতেও সহায়তা করে। কিভাবে এটি ব্যবহার করতে হয় এখানে দেওয়া হল :

  • দৈনিক এক বা দুইটি অতিরিক্ত পাকা কলা খেলে লিউকোরিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা হতে পারে।
  • আপনি দুই চা চামচ গুঁড়ো পালমিরার মিছরির সাথে কলা ফুলের রসের দুই টেবিল চামচ মেশাতে পারেন। দিনে একবার এটি খান।

4. ক্র্যানবেরি

ক্র্যানবেরি মূত্রনালীর সংক্রমণে ভুক্তভোগীদের জন্য ভালো, কারণ ক্র্যানবেরিগুলিতে অ্যান্টিসেপটিক এবং অ্যান্টিবায়োটিক বৈশিষ্ট্য আছে বলে জানা যায়। কিভাবে এগুলি ব্যবহার করতে হয় এখানে দেওয়া আছে:

  • প্রতিদিন দুই বা তিনবার এক গ্লাস করে চিনি ছাড়া ক্রানবেরি রস খেলে যোনি স্রাব দূরে রাখা যাবে।
  • ক্র্যানবেরি ট্যাবলেটও পাওয়া যায় যা ব্যাকটেরিয়াকে যোনি প্রাচীরের সাথে সংযুক্ত হতে বাধা দেয় এবং লিউকোরিয়ার সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে। কিন্তু এই ট্যাবলেট খাওয়ার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে ভুলবেন না।

5. ভারতীয় গুজবেরী (আমলা)

ভিটামিন সি-তে ভরপুর, আমলা (ভারতীয় গুজবেরী) হল আরেকটি ফল যা যৌন স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিভাবে এগুলি ব্যবহার করতে হয় এখানে দেওয়া হল:

  • মধুর সাথে এক চা চামচ গুঁড়ো ভারতীয় গুজবেরী মিশিয়ে পুরু পেস্ট তৈরি করুন। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন এটি খান।
  • এক কাপ জলে এক চা চামচ শুকনো ভারতীয় গুজবেরীর শিকড়ের গুঁড়া মেশান এবং কমে অর্ধেক হওয়া পর্যন্ত ফোটাতে থাকুন। কিছু চিনি যোগ করুন এবং প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এটি খান।

6. ডুমুর

ডুমুরের শরীরের উপর শক্তিশালী জোলাপের মতো প্রভাব আছে এবং পাশাপাশি বাড়তি যোনি স্রাবে সাহায্য করে। কিভাবে এগুলি ব্যবহার করতে হয় এখানে দেওয়া হল :

  • সারা রাত ধরে এক কাপ জলে কয়েকটি শুকনো ডুমুর ভিজিয়ে রাখুন। ভিজে যাওয়া ডুমুরকে পিষে জলের সাথে মিশ্রিত করুন এবং পরের দিন সকালে মিশ্রণটি পান করুন।
  • ডুমুর গাছ এবং বট গাছের ছাল সমান পরিমাণে নিয়ে পিষে নিন এবং মসৃণ গুঁড়া বানান। এই গুড়ার এক টেবিল-চামচ দুই কাপ জলে মেশান এবং কয়েক দিনের জন্য এটি যোনি ধোয়ার জন্য ব্যবহার করুন।

আপনি যদি আপনার গর্ভাবস্থায় অস্বাভাবিক স্রাব লক্ষ্য করেন তবে সর্বদা চিকিৎসার সাহায্য নিন এবং সর্বদা স্ব-নির্ণয় থেকে বিরত থাকুন । সবসময় নিশ্চিত হওয়া এবং আরও জটিলতা তৈরি হওয়া এড়ানো ভালো। আপনি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং আপনার যোনি এলাকা শুষ্ক রাখা নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন যে এটা 9 মাস এবং সারা জীবনের একটি যাত্রা! আপনি একটি সুখী এবং স্বাস্থ্যকর গর্ভাবস্থার জন্য উপরের সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহার করতে পারেন!