শিশুর হামাগুড়ি – ক্রমবিকাশ পর্যায়ের একটি মাইলফলক

শিশুর হামাগুড়ি - ক্রমবিকাশ পর্যায়ের একটি মাইলফলক

হামাগুড়ি দেওয়া হল শিশুর জীবনের প্রথম বছরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রমবিকাশের মাইলফলকগুলির একটি এবং হাঁটার পথে প্রথম পদক্ষেপ। হামাগুড়ি শুধুমাত্র একটি শিশুকে নিজের মতো করে এগোতেই দেয় না, এটির মাধ্যমে তারা ভারসাম্য এবং সম্মুখ চলনের দক্ষতা শিখতে পারে, পাশাপাশি পেশীর শক্তিরও বিকাশ হয়।

aniview

কখন বাচ্চারা সাধারণত হামাগুড়ি দিতে শুরু করে?

বেশির ভাগ শিশু 7 থেকে 10 মাস বয়সের মধ্যে হামাগুড়ি দিতে শুরু করে, যদিও বাচ্চারা সাধারণত 9 বা 10 মাস বয়সে শুরু করবে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, অনেক বাচ্চারা পরে হামাগুড়ি দিতে শিখছে বা এমনকি হাঁটার পথের এই পর্যায়টিকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গেছে। (যদিও এটি খুব বিরল)।

আপনার সন্তানের হামাগুড়ি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়ার লক্ষণ

শিশুর হামাগুড়ি দেওয়ার অনেকগুলি পর্যায় আছে। প্রতিটি সন্তানের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও, আপনার সন্তানের হামাগুড়ি দিতে শেখা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশু বিভিন্ন উপায়ে শিখবে, যেমন ‘নীচের দিকটি ঘষে চলা’, গড়িয়ে যাওয়া বা উপুড় হয়ে সামনের দিকে ঠেলে এগোনো, কিন্তু কিছু কিছু বাচ্চা আবার অন্যভাবে শিখবে। একইভাবে, প্রতিটি বাচ্চা বিভিন্ন সময়ে হামাগুড়ি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে, যদিও কিছু সাধারণ লক্ষণ আছে।

এই লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • অবলম্বন ছাড়াই সহজে বসতে সক্ষম হওয়া
  • মাথা সোজা করে ধরে রাখতে এবং চারপাশে তাকাতে সক্ষম হওয়া
  • উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী পা, বাহু এবং পিঠের পেশী
  • সামনে ও পিছনের দিকে দুলতে সক্ষম হওয়া

আপনার বাচ্চারা এই প্রস্তুত হয়ে ওঠার লক্ষণগুলি দেখাতে শুরু করলে, তাদের এমন উপায়ে ব্যস্ত রাখুন যাতে তাদের এই ক্ষমতাগুলি আরও বেশি বিকাশ করতে পারে, যেমন তাদের উপুড় হয়ে মেঝেতে থাকতে সময় দেওয়া, খেলার জন্য খেলনা সরবরাহ করা এবং হামাগুড়ি অনুশীলন করার জন্য নিরাপদ স্থান দেওয়া।

শিশুর হামাগুড়ি দেওয়ার শৈলীর প্রকার

শিশুদের সবচেয়ে সাধারণ ধরনের হামাগুড়ির শৈলী হল “কমান্ডো হামাগুড়ি” এবং “বটম স্কুট”। “কমান্ডো হামাগুড়ি” সাধারণত শিশুটি যখন উপুড় হয়ে বেঁকে মুচড়ে এগোতে থাকে, আর বটম স্কুট হল নিতম্বে ভর দিয়ে দ্রুত এগোনো।

শিশুর হামাগুড়ি দেওয়ার শৈলীর প্রকার

হামাগুড়ি দেওয়ার অন্যান্য শৈলীর মধ্যে রয়েছে:

  • গড়িয়ে চলা – শিশু প্রায়ই সামনে পিছনে গড়াবে যতক্ষণ না তারা সম্মুখ গতিকে আয়ত্তে আনতে পারে।
  • ভালুক হামাগুড়ি – নিম্নমুখী ভঙ্গি থেকে, শিশুরা প্রায়ই তাদের পা পিছনের দিকে নিয়ে গিয়ে উপরে ওঠাবে এবং হাত ও পা দিয়ে সামনে ও পিছনে সরবে।
  • কাঁকড়া হামাগুড়ি – বাচ্চা, কখনও কখনও, তার হাত ব্যবহার করে সামনের পরিবর্তে পিছনের দিকে ঠেলে এগোবে।
  • লাফিয়ে হামাগুড়ি –শিশু, কখনও কখনও, তাদের হাত এবং হাঁটু পেতে বসে ঠেলা দিয়ে সামনের দিকে এগোবে।
  • উচ্চশ্রেণীর হামাগুড়ি – শিশু তার হাত এবং হাঁটু পেতে বসে, তার পা ও হাত বদল করে করে এগিয়ে যাবে।
  • তিন পায়ে হামাগুড়ি – শিশুটি দুটি হাত ও একটি হাঁটু ব্যবহার করে এগোবে এবং অন্য হাঁটুটিকে বিশ্রামে রাখবে।

বাচ্চারা কিভাবে হামাগুড়ি দিতে শেখে?

একটি শিশুকে হামাগুড়ি দেওয়ানোর জন্য কিছু ব্যায়াম আছে। বেশিরভাগ শিশু উপুড় হয়ে হামাগুড়ি শুরু করবে, কারণ এটি তাদের চারপাশে দেখতে এবং পেশীর শক্তির বিকাশ করতে দেয়। বাচ্চাদের বস্তু ও প্রতিবন্ধকতার সামগ্রী দিয়ে ব্যস্ত রাখলে তা তাদেরকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করবে, এবং অবশেষে, তারা হামাগুড়ি শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় নতুন পেশী শক্তির সাথে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। যদি শিশুটি অন্য কোনো উপায়েই গতিশীল না হয়, তাহলে আপনাকে ঠিক করতে হবে যে তাদের কিভাবে এগোনোর জন্য সাহায্য করা যায়, যাতে তারা হামাগুড়ি দিতে ও পরে হাঁটতে শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বয় গড়ে তুলতে পারে। বিঃদ্রঃ: কিছু অকালে জন্মানো শিশু তাদের সমবয়সীদের তুলনায় পরে হামাগুড়ি দিতে বা হাঁটতে শিখবে।

হামাগুড়ি দেওয়া শিশুদের জন্য কঠিন ও জ্ঞানীয়, মোটর, এবং চাক্ষুষ-স্থানিক দক্ষতা প্রয়োজন হয়। হামাগুড়ি দিতে সক্ষম হবার জন্য, শিশুদের এমন ক্রিয়াকলাপে জড়িত হবে হবে যাতে তাদের পিঠ, ঘাড়, কাঁধ, বুক ও বাহুর পেশীগুলির বিকাশ ঘটে। তারা যেন তাদের ওজনকে সমর্থন করতে পারে এবং ভারসাম্য রাখতে সক্ষম হতে পারে। বেশিরভাগ শিশুদের তাদের “দূরবীক্ষণ দৃষ্টি” বিকাশ করতে হবে, যা তাদের লক্ষ্যগুলিতে মনোনিবেশ করতে দেয়, যা তাদেরকে সরতে সহায়তা করে। হামাগুড়ি তাদের গভীরতা উপলব্ধি তৈরি করতেও সহায়তা করতে পারে, যদিও কিছু গভীরতা উপলব্ধি তাদের সরতেও শুরু করতে দেয়। হামাগুড়ি দেওয়া চলতে থাকলে, এটি বাচ্চাদের বিচরণ করার এবং স্মরণে রাখার দক্ষতা বিকাশ করতে সাহায্য করতে পারে।

আপনার শিশু হামাগুড়ি না দিলে কী হবে?

আপনার সন্তান শীঘ্রই অন্যদের মতো সরতে না শিখলে, বা যদি কিছু পদ্ধতি অন্যের ক্ষেত্রে কাজ করে কিন্তু আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে কাজ না করে, তবে আপনার খুব বেশি চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনার শিশু যখন প্রস্তুত এবং সক্ষম হবে তখন সে হামাগুড়ি দেবে। বাচ্চা 10 মাস বয়সেও হামাগুড়ি না দিলে কিছু বাবা-মা চিন্তিত হয়ে ওঠেন, কিন্তু যতক্ষণ তারা অন্যান্য ধরনের নড়াচড়া প্রদর্শন করছে ততক্ষণ এটি উদ্বেগের কারণ নয়।

যদি এক বছর বয়স হওয়ার পরেও, কিছু ধরনের নড়াচড়ার বিকাশ না হয়, তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলা উচিত।

কিভাবে আপনার শিশুকে হামাগুড়ি দিতে সাহায্য করবেন?

যদিও বেশিরভাগ শিশু বেশি সাহায্য ছাড়া নিজে নিজেই হামাগুড়ি দিতে শিখে যাবে, অনেক বাচ্চাদের তাদের পিতামাতার কাছ থেকে একটু সাহায্য এবং নির্দেশনা দরকার।

আপনার সন্তানের পেশী শক্তি বিকাশ এবং তাকে এগোতে শুরু করতে সাহায্য করার জন্য কিছু পরামর্শ হল:

  • উপুড় হয়ে থাকা – কিছুক্ষণ উপুড় হয়ে থাকলে তা শিশুদের দেহকে ধরে রাখার এবং এগোনোর শক্তি বাড়ায়।
  • তাদের হাত সরানোর জন্য তাদের বাধ্য করা – শিশুদের মাথা উত্তোলন করতে সক্ষম হতে সাহায্য করা তাদের জন্য ভালো ব্যায়াম, যা একই সময়ে তাদের পেশীগুলিরও বিকাশ ঘটাচ্ছে।
  • খেলনা চারপাশে সরানো – খেলার সময়টিকে মজাদার করলে এবং খেলনা দিয়ে আপনার সন্তানকে আনন্দ দিলে, তাকে হামাগুড়ি শুরু করতে সহায়তা করতে পারে। নাগালের বাইরে বস্তু স্থাপন করলে তাদের দেহকে সরাতে এবং পেশী শক্তিকে বিকাশ করতে সহায়তা করবে।

আপনার বাচ্চাকে হামাগুড়ি দিতে সাহায্য করার জন্য অন্য কিছু পরামর্শ প্রধানত পিতামাতার ব্যক্তিগত চাহিদাগুলির সাথে সম্পর্কিত। কিছু বাবা-মা কংক্রিট পদ্ধতি, যেমন টানেল বা পিক-আ-বু গেম ব্যবহার করতে পছন্দ করেন, অন্যরা উপবিষ্ট হয়ে থাকার উপর সময়ের সীমাবদ্ধতা আরোপ করার মতো উপায় ব্যবহার করেন। সাধারণত, প্রাথমিক পর্যায়ে আপনার সন্তানকে এমন ক্রিয়াকলাপগুলিতে জড়িত করা একটি ভাল আইডিয়া যা তাদের দক্ষতাগুলি বিকাশ করতে সহায়তা করবে, যা তাদেরকে হামাগুড়ি দিতে সক্ষম করতে পারে।

শিশুর নিরাপদ হামাগুড়ির জন্য অন্যান্য পরামর্শ

আপনার বাচ্চা যখন হামাগুড়ি শুরু করে তখন কী করবেন তার জন্য বোর্ড জুড়ে অনেক পরামর্শ রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই হল আপনার বাড়ি বা সেই এলাকা যেখানে বাচ্চা হামাগুড়ি দেবে বা হামাগুড়ি দিতে শিখবে সেটিকে বাচ্চাদের জন্য সুরক্ষিত করার বিষয়ে।

শিশুর নিরাপদ হামাগুড়ির জন্য অন্যান্য পরামর্শ

সন্তানের জন্য বাড়ি সুরক্ষিত করার জন্য কিছু পরামর্শ হল:

  • সিঁড়ির পথে দরজা লাগান – তাদের সিঁড়ি বেয়ে হামাগুড়ি দিতে সাহায্য করার জন্য বাক্স ব্যবহার করুন, কিন্তু সেগুলিকে সুরক্ষামূলক উপাদান দিয়ে ঢেকে দিন যতক্ষণ না তারা সিঁড়িতে চলার সাথে মানিয়ে নিতে পারে।
  • এগোতে উৎসাহ দিতে নিরাপদ খেলনা এবং বস্তু দেওয়া – আপনার সন্তানের হাতের নাগালের মধ্যে থেকে শ্বাসসরোধকারী, ধারালো বস্তু এবং সহজে ভেঙে যেতে পারে এমন বস্তুগুলি সরান।
  • বাধা অপসারণ করুন – সাধারণ বাধাগুলির মধ্যে রয়েছে ঝুলন্ত দড়ি, উন্মুক্ত আউটলেট, ভারী আসবাবপত্র এবং সুরক্ষিত নয় এমন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী।

শিশুর নিরাপদ হামাগুড়ির জন্য অন্যান্য পরামর্শ হল:

  • বড় ভাইবোনদের সাহায্য নেওয়া
  • শিশুকেএকাবাতত্ত্বাবধানহীনভাবেছেড়েনারাখা
  • আপনার সন্তান যে পৃষ্ঠতলের উপর হামাগুড়ি দেয় সেটি পরিষ্কার রাখা
  • চলার জন্য নিরাপদ কৌশলগুলি ব্যবহার করা (উদাঃ পড়ে যেতে পারে এমন কোনো বস্তু না রাখা, শুরুর দিকে উপরের দিকে চড়তে না দেওয়া)

শিশুর ক্রলিং বিকাশ

হামাগুড়ির পর কী?

হামাগুড়ি দেওয়ার পরে, সন্তানরা (অনুশীলনের মাধ্যমে) ধীরে ধীরে এমন দক্ষতা বিকাশ করবে যা তাদের হাঁটার জন্য প্রয়োজনীয় গতিশীলতা দেয়। একবার সন্তানেরা আসবাবপত্রের উপর নিজেদেরকে টেনে তুলতে শুরু করলে এবং নিজেদেরকে স্থির রাখতে অন্য বস্তুর ব্যবহার করলে, আপনি জানবেন যে আপনার সন্তান হাঁটার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। একবার তারা তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ভারসাম্য অর্জন করতে সক্ষম হলে, আসবাবপত্র বা বস্তু ধরে থাকা অবস্থায় এবং অবশেষে কোনও সাহায্য ছাড়াই শিশুরা চলতে পারবে। এই মুহুর্ত থেকে, চলাফেরার অন্যান্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলি, যেমন, দৌড়ানো, ঝাঁপানো এবং লাফানো, শেখাটাই শুধু একটি ব্যাপার।

হামাগুড়ি দেওয়া আপনার বাচ্চার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকাশমূলক মাইলফলক, এবং এটি স্বাভাবিকভাবেই খুব বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বেশিরভাগ শিশু 9 থেকে 10 মাস বয়সের মধ্যে হামাগুড়ি দিতে শিখতে পারে, যদিও শিশুরা তাদের নিজের গতিতে শিখবে এবং প্রায়ই বিভিন্ন উপায়ে হামাগুড়ি দেবে। আপনার বাচ্চা হামাগুড়ি দিতে প্রস্তুত হওয়ার অনেক লক্ষণ আছে, এবং আপনি তাদের নিরাপদভাবে এগুলি করার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করবেন। হামাগুড়ি দেওয়া, নিঃসন্দেহে, হাঁটার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।